ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভাষণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাওবাদ-মনোভাবাপন্নদের ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দেন। ১৫ আগস্ট তাঁর ব্যবহার করা এই শব্দযুগল দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। পরদিনই সামাজিক মাধ্যমে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মতো নতুন ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে। এটির নাম ‘দিমাগি নকশাল পার্টি’।
ইনস্টাগ্রামে খোলা এই অ্যাকাউন্ট রাতারাতি আলোচনায় এসেছে। এক দিনে এর অনুসারী আড়াই লাখ ছাড়িয়েছে। ‘দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি’ নামে একটি এক্স অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে। সেখানেও অনুসারী বাড়ছে।
ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে দেওয়া প্ল্যাটফর্মটির বায়ো অনুযায়ী, তাদের মূলমন্ত্র– ‘ভাবুন, গবেষণা করুন, প্রতিরোধ করুন’। ইনস্টাগ্রাম বায়োতে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লেখা হয়েছে ‘একজন দিমাগি ভারতীয়’। আর সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এমন একজনকে, যার পরিচয়ের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘৫৬ ইঞ্চি’।
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ঠিক কবে খোলা হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। তবে এক্স অ্যাকাউন্ট ২০২৬ সালের আগস্টে খোলা হয়েছে। গত সোমবার পেজটিতে দাবি করা হয়, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখা হয়, ‘ইনস্টাগ্রামে @DNJP_India-এর বিরুদ্ধে সাইবার হামলা শুরু হয়েছে। দেখা যাক, তারা আমাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে পারে কিনা!’
নতুন প্ল্যাটফর্মটির ইনস্টাগ্রাম ও এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া বিভিন্ন পোস্ট অনুযায়ী, তারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা ভগৎ সিংয়ের আদর্শ অনুসরণ করছে। একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘তারা যদি আমাদের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার চেষ্টা করে কিংবা আমাদের দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে মনে রাখবেন, তারা ভগৎ সিংকে অসম্মান করছে।’
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৬২টি পোস্ট করা হয়। প্রায় ৩৫ জনকে অনুসরণ করে পেজটি। ইনস্টাগ্রামের পাশাপাশি এক্স হ্যান্ডলেও ‘দিমাগি নকশাল’রা সক্রিয়। ২৪ ঘণ্টায় বেশ কয়েকটি পোস্টও করা হয়েছে।
সরব বিরোধী দলের নেতারা
দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লার প্রাকার থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে নকশালপন্থিদের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় মোদি সতর্ক করেন, আদর্শগত হুমকি এখনও দূর হয়নি। তিনি বলেন, ‘অস্ত্রধারী নকশালদের নির্মূল করা গেলেও সমাজ থেকে দিমাগি নকশালদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার সময় এসেছে।’
তাঁর এই মন্তব্যের জেরে শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক। ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে ঠিক কাদের কথা বুঝিয়েছেন মোদি, তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। আত্মপ্রকাশ করে ‘দিমাগি নকশাল পার্টি’। মন্তব্যটির বিরোধিতা করে সুর চড়িয়েছেন কংগ্রেসের একাধিক নেতা। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেন, ‘আমি একজন দিমাগি নকশাল হতে পেরে গর্বিত।’
তাঁর মন্তব্যের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু গত রোববার সংবাদমাধ্যমে বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়িয়ে যারা ৩৭০ ধারাকে সমর্থন জানান এবং দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করতে চান, মূলত তাদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে কংগ্রেসের সাংসদ জয়রাম রমেশ এক্স পোস্টে লিখেছেন, প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিরোধীদের ‘আরবান নকশাল’ বলতেন। এখন তিনি ‘দিমাগি নকশাল’ বলছেন। এটা মোদির হতাশার এক নিশ্চিত লক্ষণ।
গত সোমবার এক ভিডিও বার্তায় আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ভগৎ সিং ও বি আর আম্বেদকর বেঁচে থাকলে ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার কারণে প্রধানমন্ত্রী তাদেরও বুদ্ধিবৃত্তিক নকশাল বা দিমাগি নকশাল বলতেন।
সিজেপির সঙ্গে মিল
গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এক আদালতে মন্তব্য করেন, কিছু পরজীবী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আক্রমণ করছে। কিছু তরুণকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্যে সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। ক্ষোভ বাড়তে থাকলে এক্সে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক হওয়া অভিজিৎ দীপকে লেখেন, ‘যদি সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়?’
এর পর তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলেন। শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। প্ল্যাটফর্মটি এখন মোদির জন্য যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে এলো ‘দিমাগি নকশাল পার্টি’। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন– এই পার্টিও কি সিজেপির মতো মোদির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে চলেছে?
খবর এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দুর।
এ জাতীয় আরো খবর..