ভারতের মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার একটি বিদ্যালয়ের হোস্টেলে কয়েক ছাত্রীর মধ্যে হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়। কারণ ছাড়াই কান্নাকাটি, হাসি ও অজ্ঞান হতে শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যে আশপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে- বিদ্যালয়টিতে ভূত বা প্রেতাত্মা ভর করেছে।
সম্প্রতি এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা গণহারে হোস্টেল ছাড়তে শুরু করে। স্কুল ক্যাম্পাসে অতিপ্রাকৃতিক কিছু ঘটার উদ্বেগ থেকে অভিভাবকরাও সন্তানদের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ দল পাঠায় রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ।
বুধবার এক প্রতিবেদনে হিন্দুস্থান টাইমস জানিয়েছে, অমরাবতী জেলার ডোমা গ্রামের ওই সরকারি আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ। বিদ্যালয়টি প্রায় ৪৭ বছরের পুরোনো। ভূতের ভয় ছড়িয়ে পড়ার পর ৮৫২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬১০ জন হোস্টেল ছেড়ে চলে যায়।
যেভাবে ছড়ায় ভূতের গল্প
ঘটনার উৎসের বিষয়ে তদন্তকারী দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, ডোমা থেকে দূরের একটি গ্রামের এক নারী সম্প্রতি দাবি করেন, তিনি অলৌকিক ছায়া দেখেছেন। এরপর অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। তার সঙ্গে বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর দেখা হয়েছিল। এরপর ওই ছাত্রীও কারণ ছাড়া কান্না ও হাসাহাসি শুরু করে। এই আচরণ দ্রুতই হোস্টেলের অন্যদের মাঝেও দেখা দেয়।
এরপর একাধিক গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে একটি ছিল বিদ্যালয়ের মহুয়া গাছ কাটা। শিক্ষার্থীদের একাংশ ও স্থানীয়দের বিশ্বাস ছিল, গাছটিতে প্রেতাত্মা থাকতো। কাটার পর সেই আত্মা ছাত্রীদের ওপর ভর করে। আরেকপক্ষ মনে করে, স্কুলের পয়ঃনিষ্কাশনের নালার কারণে স্থানীয় একটি মন্দিরের দেবী অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এছাড়া, স্কুলের কাছের এক মাঠে আদিবাসী যুবকের মৃত্যুকে ঘিরেও নানা কথা ডালপালা মেলে।
মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য নন্দিনী যাদব জানান, কিছু পরিবার মেয়েদেরকে ভুমকা বা আদিবাসী কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কবিরাজরা বলেছিলেন, মেয়েরা ‘চকওয়া’ বা পথ ভুলিয়ে দেওয়া অলৌকিক ঘটনার প্রভাবে পড়েছে। এরপর তারা নানা আচার অনুষ্ঠান পালন করেন।
শিক্ষার্থীরা কী বলেছে
যেসব ছাত্রী অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল তাদের একজন দ্বাদশ শ্রেণির শিবানী কালসেকর। মাথা ঘোরার কথা বলে সে হোস্টেল ছেড়ে বাড়িতে যায়। শিবানী বলে, ঘটনা নিয়ে এখন তার কিছুই মনে নেই।
একাদশ শ্রেণির ছাত্রী জাহ্নবী মারাসকোলহে পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। সে জানায়, একদিন হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই ছাত্রীরা কাঁদছিল, হাসছিল ও অজ্ঞান হয়ে পড়ছিল। হোস্টেলে এর আগে কখনোই এমন কিছু ঘটেনি।
জাহ্নবী ইতোমধ্যে হোস্টেলে ফিরে এসেছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ জন ছাত্রী হোস্টেলটিতে অবস্থান করছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় চৌধুরী জানান, কাউন্সেলিং করে ছাত্রীদের পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এরইমধ্যে কয়েকজন ফিরে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ যা বলছে
হোস্টেলটিতে স্বাস্থ্য বিভাগের দল অলৌকিক ঘটনার আলামত পায়নি। ঘটনার কারণ হিসেবে তারা ‘ডিসোসিয়েটিভ’ বা ‘কনভার্সন সিম্পটম’ এর কথা বলেছেন। এগুলো মানসিক চাপজনিত শারীরিক উপসর্গ। এটিকে তারা ‘সিলেক্টিভ হিস্টিরিয়া’ বলেও উল্লেখ করেন।
আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও পিটিআইকে বলেছেন, লক্ষণগুলোর সঙ্গে কোনো অলৌকিক ঘটনার সংযোগ নেই। মানসিক চাপের কারণে তৈরি হওয়া ‘সিলেক্টিভ হিস্টিরিয়া’র মতো পরিস্থিতি থেকে এমনটি হয়ে থাকতে পারে।
জেলা মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ স্বাতী সোনোনে বলেন, এটি প্রকৃতপক্ষে ‘মাস হিস্টিরিয়ার’ ঘটনা। এ ধরনের মানসিক লক্ষণ একজনের মধ্যে দেখা দিলে অন্যরাও অবচেতনভাবে একইরকম আচরণ করে।
মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি হোস্টেলটিতে গিয়ে দেখেছে, কয়েকটি কক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব ছিল। কক্ষগুলো অতিরিক্ত জনাকীর্ণ। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..