রিও ডি জেনেইরোর ক্লাব ফ্লামেঙ্গো আর উরুগুয়ের জাতীয় দল দুটি ভিন্ন ঠিকানা, কিন্তু এক সুতোয় বাঁধা তিন ফুটবলার; জর্জিয়ান দে আররাস্কায়েতা, নিকোলাস ডে লা ক্রুজ, গিয়ের্মো ভারেলা। ক্লাবের বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বকে তারা এবার নিয়ে যেতে চান বিশ্বকাপের মঞ্চে। যেখানে তাদের লক্ষ্য অতীতের আক্ষেপ ঘুচিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা।
রিও ডি জেনেইরো আর মন্টেভিডিওর দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। কিন্তু এই তিনজনের কাছে সেই দূরত্ব যেন কেবলই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ। মাঠে যেমন তাদের সমন্বয় দিন দিন নিখুঁত হয়েছে, মাঠের বাইরেও তেমনি গড়ে উঠেছে গভীর বন্ধন। ডে লা ক্রুজের ভাষায়, ২০১৯-২০ সাল থেকেই তাদের পরিচয়, আর সেই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। কাতার বিশ্বমঞ্চে হতাশাজনক বিদায়ের স্মৃতি এখনো তাজা, তাই এবার তাদের লক্ষ্য অন্তত পরের ধাপে পৌঁছানো।
ডি আররাস্কায়েতা মনে করেন, একই দেশের খেলোয়াড় ক্লাবে থাকলে নিজের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখা সহজ হয়। আর সেই কারণেই ফ্লামেঙ্গোর এই উরুগুইয়ান ত্রয়ী নিজেদের ভেতরে এক আলাদা আবহ তৈরি করেছেন। ২০১৯ সালে প্রথম ফ্লামেঙ্গোয় যোগ দেন ডি আররাস্কায়েতা। তখন পাশে নিজের দেশের কেউ না থাকলেও দ্রুতই মানিয়ে নেন এবং হয়ে ওঠেন ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সফল মুখ। এরপর ২০২২ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন পুরনো সঙ্গী ভ্যারেলা, যাদের বন্ধুত্বের শুরু ২০১৩ সালে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল বিশ্বকাপে একসঙ্গে খেলার সময় থেকে। জাতীয় দলে পরবর্তীতে ডে লা ক্রুজের সঙ্গে পরিচয়, আর ফ্লামেঙ্গোয় এসে সেই বন্ধন পূর্ণতা পায়।
২০২৩ সালে ডে লা ক্রুজ যখন রিওতে আসেন, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন দুই আপন মানুষ। শহর, ক্লাব, দৈনন্দিন জীবন; সবকিছুতেই তারা তাকে সাহায্য করেছেন। এমনকি তার পরিবারকেও আপন করে নিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তারা। বয়সে ছোট হলেও অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন ডে লা ক্রুজ, বিশেষ করে যখন তারা একসঙ্গে বসেন নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন নিয়ে।
মাঠের বাইরের এই সময়গুলোতেই ফুটে ওঠে তাদের আসল বন্ধন। বারবিকিউ, মাতে পান কিংবা তাসের খেলা; সব মিলিয়ে তারা চেষ্টা করেন নিজেদের দেশকে একটু হলেও কাছে টেনে আনতে। কখনো কখনো ডে লা ক্রুজ বানিয়ে ফেলেন ঘরোয়া খাবারও। তাদের কাছে বন্ধু আর পরিবারের উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
কনমেবল লিবারতাদোরেস জয়ের পর প্রতিবারই তারা উরুগুয়ের পতাকা হাতে উদযাপন করেন। ক্লাবের হয়ে সাফল্যের মাঝেও নিজেদের দেশের প্রতি এই টান তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করে। এবার সেই গর্ব নিয়েই তারা তাকিয়ে আছেন বিশ্বমঞ্চের দিকে। আসন্ন বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব, কেপ ভার্দে ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। পথটা সহজ নয়, কিন্তু তাদের বিশ্বাস দৃঢ়।
ডি আররাস্কায়েতা ও ভ্যারেলার জন্য এটি তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভ্যারেলার কাছে এটি হয়তো শেষ অধ্যায়। তাই এই আসরটিকে উপভোগ করার পাশাপাশি উরুগুয়েকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তার কথায়, কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
ফ্লামেঙ্গোয় গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্ব এখন কেবল ক্লাবের সীমায় আটকে নেই। তিন যোদ্ধার চোখে এখন একটাই লক্ষ্য; নিজ দেশের জন্য বড় কিছু অর্জন করা। তাদের গল্প তাই শুধু বন্ধুত্বের নয়, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখারও।
এ জাতীয় আরো খবর..