✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২৩, | ২৩:১৪:০২ |বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন কীভাবে ও কখন তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কলোরাডো নদীর প্রাচীন গতিপথ ও জিরকন খনিজ কণা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্প্রতি এ গিরিখাতের জন্মরহস্য নিয়ে নতুন তথ্য মিলেছে।
কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও কলোরাডো নদীর প্রাচীন গতিপথের নিরন্তর সংগ্রামের এক রোমাঞ্চকর কাহিনীই উন্মোচিত হয়েছে সাম্প্রতিক এ গবেষণায়।
রয়টার্স লিখেছে, উত্তর আমেরিকার প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের এক বিস্ময় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত এ শ্বাসরুদ্ধকর ভৌগোলিক নিদর্শনটি এর নাটকীয় গঠন ও বর্ণিল দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত।
লাখ লাখ বছর ধরে কলোরাডো নদীর প্রবল স্রোত এ গিরিখাতটি তৈরি করেছে। নদীটি কীভাবে ও কখন এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল সেই বিষয়ে নতুন তথ্য মিলেছে এ গবেষণায়।
নদীর বয়ে আনা পলি দিয়ে তৈরি বেলেপাথরের মধ্যে থাকা জিরকন নামের খনিজ কণা ও অনেক আগের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ছাই পরীক্ষা করে গবেষকরা প্রাচীনকালে এ নদীর গতিপথ শনাক্ত করতে পেরেছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৬৬ লাখ বছর আগে নদীটি উত্তর-পূর্ব অ্যারিজোনার এক বিশাল নিচু এলাকায় (যাকে বেসিন বা অববাহিকা বলে) প্রবাহিত হতে শুরু করে। ফলে বর্তমানে যেখানে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অবস্থিত তার ঠিক পূর্ব দিকে প্রশস্ত ও অগভীর এক হ্রদ তৈরি হয়েছিল।
গবেষকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হ্রদের পানি বাড়তে থাকে এবং প্রায় ৫৬ লাখ বছর আগে হ্রদের তীরের এক নিচু অংশ দিয়ে উপচে পড়তে শুরু করে। এ উপচে পড়া প্রবল স্রোতটিই সেই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা পরবর্তীকালে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে পরিণত হয়েছে।
এরপর নদীটি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ভাটির দিকে আরও কয়েকটি অববাহিকা পূর্ণ করে এবং একইভাবে সেগুলো ছাপিয়ে এগিয়ে যায়। অবশেষে প্রায় ৪৮ লাখ বছর আগে তা ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে পৌঁছায় এবং উত্তর-পশ্চিম মেক্সিকোর এক স্থানে সাগরে গিয়ে মেশে।
এ হ্রদটি সম্ভবত দেড়শ কিলোমিটারেরও বেশি চওড়া ছিল, যা অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় ভৌগোলিক এক গঠনের নাম অনুসারে গবেষকরা এ হ্রদকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘বিডাহোচি হ্রদ’ নামে ডাকছেন। এর বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ‘নাভাহো নেশন’ নামের সংরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত ছিল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস’ বা ইউসিএলএ’র ভূতাত্ত্বিক জন হে বলেছেন, “গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ঠিক কবে তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে এবং আমাদের এ গবেষণা সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
“কল্পনা করুন, আপনি নদীর তীরে গিয়ে এক মুঠো বালু তুললেন। সেই মুঠোভরতি বালুর মধ্যে লাখ লাখ কণা আছে, যা দেখতে অন্য যে কোনো সাধারণ বালুর মতোই। ওই এক মুঠো বালুর মধ্যেই হয়ত কয়েকশ বা কয়েক হাজার অতি ক্ষুদ্র জিরকন ক্রিস্টাল বা স্ফটিক কণা থাকতে পারে। যার প্রতিটি কণা নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে সেই বালুটি ঠিক কোথা থেকে এসেছে তার বিস্তারিত তথ্যের ভাণ্ডার।”
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, জিরকন কণাওয়ালা নদীর বালুর বিভিন্ন স্তর ঠিক কখন জমা হয়েছিল।
কলোরাডো নদী কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের ‘রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক’-এর ‘লা পুদ্রে পাস’ থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যা প্রায় ২ হাজার ৩শ ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ।
অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফে অবস্থিত ‘ইউএস জিওলজিকাল সার্ভে’র গবেষণা ভূতাত্ত্বিক ও এ গবেষণার অন্যতম লেখক রায়ান ক্রো বলেছেন, “দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ছিল, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আগে কলোরাডো নদী আসলে কোথায় যেত?
“আমরা অনেক আগে থেকেই জানতাম, ১১০ লাখ বছর আগে পশ্চিম কলোরাডোতে এ নদীটির অস্তিত্ব ছিল এবং ৫৬ লাখ বছর আগ পর্যন্ত তা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়নি। তবে মাঝখানের এ সময়টাতে নদীটি কোথায় ছিল সে সম্পর্কে আমরা এখনপর্যন্ত প্রায় কিছুই জানতাম না।”
গবেষক ক্রো বলেছেন, নদীর এই গতিপথ তৈরিতে অন্যান্য ভৌগোলিক প্রক্রিয়াও হয়ত ভূমিকা রেখেছিল।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দেয়ালগুলোতে থাকা পাললিক ও আগ্নেয় শিলাগুলো প্রায় ১৮০ কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এ বিশাল গিরিখাতটি লম্বায় প্রায় সাড়ে চারশ কিলোমিটার, চওড়ায় প্রায় ২৯ কিলোমিটার এবং এর গভীরতা প্রায় ৬ হাজার ১০০ ফুটের বেশি।
রায়ান ক্রো বলেছেন, “আগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ লাখ বছর ধরে কলোরাডো নদী প্রতি ১০ লাখ বছরে গড়ে প্রায় একশ থেকে একশ ৬০ মিটার গভীরতায় শিলা কেটে চলেছে, অর্থাৎ গিরিখাত তৈরির এ প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে। আমরা আজ যে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখছি তা গত প্রায় ৫০ লাখ বছর ধরে নদীর নিরন্তর প্রবাহ ও ভূমিক্ষয়েরই ফল।”
এ গিরিখাতটি আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগিয়ে তোলে।
রায়ান ক্রো বলেছেন, “বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখার পর তা প্রায় প্রত্যেকেরই মনোযোগ ও কৌতূহল কেড়ে নেয়। মানুষ একেক রকমভাবে এর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন।
“তবে আমার মনে হয় যারা ভূতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা ভাবেন না তারাও গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখলে একই ধরনের প্রশ্ন করেন। এ গিরিখাতটি কীভাবে তৈরি হল? ঠিক কখন তৈরি হয়েছিল? আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজারই চেষ্টা করি।”
গিরিখাতের দেয়ালগুলো সম্পর্কে জন হে বলেছেন, “পৃথিবীর গঠনশৈলী এখানে আমাদের সামনে একদম উন্মুক্ত হয়ে আছে। পাথরের এক বিশাল ও সুউচ্চ দেয়ালের দৃঢ়তা দেখে লাখ লাখ বছরের ভূতাত্ত্বিক সময়কে কল্পনা করাটা সত্যিই বেশ নাড়া দেওয়ার মতোই।”