প্রতিকূলতা আর চাপের মুখেও একজন মহীয়সী নারী কীভাবে আরেকজন মহান মানুষকে গড়ে তুলতে পারেন, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বিবি আছিয়া। ইতিহাসে তিনি ফেরাউনের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও, তার বড় পরিচয় তিনি ছিলেন হজরত মুসার (আ.) পালক মাতা।
ঈসা (আ.)-এর মা মারিয়ামের মতো আল্লাহ আছিয়াকেও মনোনীত করেছিলেন একজন নবীকে আগলে রাখার জন্য। ফেরাউনের মতো দম্ভ আর ক্ষমতার চূড়ায় থাকা ব্যক্তির স্ত্রী হয়েও আছিয়ার হৃদয়ে ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। বিলাসিতা আর রাজকীয় ঐশ্বর্যের মাঝে থেকেও তিনি বুঝেছিলেন, স্রষ্টাকে ছাড়া মানুষ আসলে নিঃস্ব।
বুখারি শরিফের এক হাদিসে এসেছে, পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছেন, কিন্তু নারীদের মধ্যে মারিয়াম ও আছিয়া ছাড়া কেউ সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেননি।
নীলনদ থেকে রাজপ্রাসাদে
মুসা (আ.)-এর জন্মদাত্রী মা যখন পরিস্থিতির চাপে পড়ে কলিজার টুকরো সন্তানকে ঝুড়িতে ভরে নীলনদে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন চরম শোকাতুর। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। আছিয়ার পরিচারিকারা নদী থেকে শিশু মুসাকে (আ.) উদ্ধার করে রানীর কাছে নিয়ে আসেন। দয়ালু আছিয়া প্রথম দেখাতেই এই শিশুর মায়ায় পড়ে যান এবং তাকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ফেরাউনকে অনুরোধ করেন।
কোরআনের বর্ণনায় আছিয়া ফেরাউনকে বলেছিলেন, এই শিশুটি আমার ও তোমার চোখের শীতলতা। একে হত্যা করো না, হয়তো সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।
চরিত্র গঠনে প্রভাব
মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার মতো গুণগুলো শৈশবেই গড়ে ওঠে। মুসা (আ.) বড় হয়ে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তার পেছনে মা আছিয়ার দেওয়া শিক্ষার প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশে বড় হলেও আছিয়া তাকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে শিখিয়েছিলেন।
ইবনে কাসিরের মতে, মুসা (আ.)-এর স্তন্যদানের জন্য তার নিজের মাকেই প্রাসাদে রাখা হয়েছিল। ফলে জন্মদাত্রী মা এবং পালক মাতা—উভয়ের ভালোবাসায় বড় হয়েছেন তিনি। যৌবনে পৌঁছানোর আগেই মুসা (আ.) বনী ইসরায়েলের ওপর চলা জুলুম ও মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন।
ঈমানের জন্য আত্মত্যাগ
একটা সময় ফেরাউন জানতে পারেন যে, তার স্ত্রী গোপনে মুসা (আ.)-এর ইলাহ বা আল্লাহর ইবাদত করেন। এতে তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। ফেরাউন তার স্ত্রীকে ভয় দেখান এবং প্রলোভন দেখান। কিন্তু আছিয়ার হৃদয় ততক্ষণে এক আল্লাহর প্রেমে সিক্ত।
ফেরাউন তাকে দুটি পথের কোনো একটি অবলম্বনের অবকাশ দেন। তাকে বলেন, হয় ফেরাউনকে উপাস্য মানতে হবে, নয়তো অকথ্য নির্যাতনে মৃত্যু বরণ করতে হবে। আছিয়া হাসিমুখে মৃত্যুকেই বেছে নেন। নির্যাতনের সেই চরম মুহূর্তে তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন, হে আমার রব! আমার জন্য আপনার কাছে জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে মুক্তি দিন।
একজন মা হিসেবে আছিয়া আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশেও সন্তানদের আল্লাহর পথে গড়ে তুলতে হয়। ঈমানের প্রতি তার দৃঢ়তা আজীবন বিশ্বাসী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
এ জাতীয় আরো খবর..