আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের চাপ ও খারাপ কর্মপরিবেশের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। এই মৃত্যুর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো, দীর্ঘ সময় কাজ করা, চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কর্মস্থলে হয়রানি। এসব সমস্যার ফলে হৃদরোগ, মানসিক অসুস্থতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪.৫ কোটি বছর সুস্থ জীবন নষ্ট হয়।
অর্থাৎ মানুষ অসুস্থতা, অক্ষমতা বা অকালমৃত্যুর কারণে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ক্ষতি হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবছর বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ১.৩৭ শতাংশ ক্ষতি হয় এই সমস্যাগুলোর কারণে। প্রতিবেদনটি আরো জানায়, কাজের ধরন, ব্যবস্থাপনা এবং কর্মপরিবেশ এখন কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
তাই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত চাকরি এবং কর্মস্থলের হয়রানির মতো সমস্যাগুলো ঠিকভাবে সমাধান না করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
সহজভাবে : মনস্তাত্ত্বিক কর্মপরিবেশ কী?
মনস্তাত্ত্বিক কর্মপরিবেশ বলতে বোঝায়, কাজের ধরন, কাজের নিয়মকানুন এবং অফিসের পরিবেশ কীভাবে একজন কর্মীর মানসিক অবস্থা, স্বাস্থ্য ও কাজের দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। এটি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
১. কাজের ধরন (কাজটি কেমন)
কাজ কতটা কঠিন, দায়িত্ব কত বেশি, কাজটি কর্মীর দক্ষতার সাথে মেলে কিনা, প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়া যায় কি না, এসব বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
২. কাজের ব্যবস্থাপনা (কাজ কীভাবে পরিচালিত হয়)
কর্মীর দায়িত্ব পরিষ্কার কিনা, তার ওপর কতটা চাপ দেওয়া হচ্ছে, সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা, বস বা সহকর্মীদের সহায়তা পাচ্ছে কি না, এসব বিষয় এতে পড়ে।
৩. প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও নীতি
কাজের সময়সূচি, চাকরির নিরাপত্তা, কর্মীদের মূল্যায়ন ও পুরস্কার ব্যবস্থা, কর্মস্থলে হয়রানি বা সহিংসতা রোধের নিয়ম, এসব বড় নীতিগুলোও কর্মপরিবেশে প্রভাব ফেলে।
এই তিনটি বিষয় ভালো হলে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং কাজের ফলও ভালো হয়। কিন্তু এগুলো খারাপ হলে মানসিক চাপ বাড়ে, অসুস্থতা তৈরি হয়। তাই প্রতিবেদনটি বলছে, সরকার, প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করে এসব সমস্যা কমাতে হবে, যাতে কর্মক্ষেত্র আরো নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর হয়।
আইএলও যেভাবে ৮ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যুর হিসাব করেছে
প্রতি বছর ৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মৃত্যুর এই সংখ্যাটি দুটি প্রধান প্রমাণের উৎস ব্যবহার করে অনুমান করা হয়েছে।
প্রথমটি হলো কর্মক্ষেত্রে পাঁচটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির বিশ্বব্যাপী ব্যাপকতার তথ্য। যেমন কাজের চাপ (উচ্চ চাহিদার সাথে নিয়ন্ত্রণের অভাব), প্রচেষ্টা ও পুরস্কারের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপীড়ন ও হয়রানি।
দ্বিতীয়টি হলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা দেখায় কীভাবে এই ঝুঁকিগুলো হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং আত্মহত্যাসহ মানসিক অসুস্থতার মতো গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।
এরপর এই ঝুঁকির মাত্রাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ সমীক্ষার সর্বশেষ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার ও স্বাস্থ্য তথ্যের উপর প্রয়োগ করা হয়, যাতে প্রতি বছর এই ঝুঁকিগুলোর কারণে সৃষ্ট মৃত্যু এবং প্রতিদিন সংখ্যা অনুমান করা যায়।
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বুঝতে পেরেছে, এই সমস্যাগুলো মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপর কত বড় প্রভাব ফেলছে। একদিকে, কত মানুষ অসুস্থ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে (মানবিক ক্ষতি) অন্যদিকে, অসুস্থতার কারণে কাজ কম হওয়ায় অর্থনীতিতে কত ক্ষতি হচ্ছে (অর্থনৈতিক ক্ষতি)।
বিশেষ করে, মানুষ অসুস্থ বা অকালমৃত্যুর কারণে যত বছর সুস্থভাবে কাজ করতে পারত, সেই হারানো সময়ের কারণে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এর প্রভাব জিডিপিতেও দেখা যায়।
প্রতিবেদনটি আরো বলছে, কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ ও ঝুঁকি শুধু মনেই প্রভাব ফেলে না, শরীরেও নানা সমস্যা তৈরি করে। যেমন, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ, হৃদরোগসহ, শারীরিক অসুস্থতা, বিপাকীয় সমস্যা (যেমন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি), পেশী ও হাড়ের ব্যথা, ঘুমের সমস্যা।
কর্মক্ষেত্রের খারাপ মানসিক পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি, দুটোরই বড় ক্ষতি করছে। তাই এই সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা জরুরি।
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকিগুলো সক্রিয়ভাবে মোকাবেলা করার মাধ্যমে দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো এমন স্বাস্থ্যকর কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যা কর্মী ও সংস্থা উভয়েরই উপকারে আসে এবং একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করে।
কাজের জগতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যেমন ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাসা থেকে কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) এবং নতুন ধরনের চাকরির ব্যবস্থা। এসব পরিবর্তন ঠিকভাবে সামলানো না গেলে আগের মানসিক চাপ আরো বাড়তে পারে, এমনকি নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তবে ভালোভাবে ব্যবহার করা গেলে এগুলো কাজকে আরো সহজ ও নমনীয়ও করতে পারে।
আইএলও-এর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এখনকার কর্মজগতে মানসিক ঝুঁকি বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীদের সুস্থ রাখার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও ভালো কর্মপরিবেশ খুব জরুরি।
যদি সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে এসব সমস্যার সমাধান করে, তাহলে কর্মক্ষেত্র আরও স্বাস্থ্যকর হবে। এতে কর্মী ও প্রতিষ্ঠান দুইপক্ষই লাভবান হবে এবং অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..