মানব সৈন্যের বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট পাঠাচ্ছে ইউক্রেন

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২০, | ১২:২৫:৪২ |

যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বদলে রোবট, শুনতে ভবিষ্যতের গল্প মনে হলেও বাস্তবে তা এখন ঘটছে ইউক্রেনে। সম্প্রতি এক অভিযানে কোনো প্রকার গুলি ছোড়া ছাড়াই রুশ বাহিনীর একটি অবস্থান দখল করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। মজার বিষয় হচ্ছে, এই অভিযানে সরাসরি অংশ নেয়নি কোনো মানব সৈন্য, পুরো অভিযান চালানো হয় স্থল রোবট ও ড্রোন দিয়ে।

ইউক্রেনের থার্ড সেপারেট অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি১৩’ ইউনিটের কমান্ডার মিকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘একটি গুলিও না ছুঁড়ে আমরা রুশ বাহিনী অবস্থানটি দখল করি।

তিনি আরো জানান, ‘গত গ্রীষ্মে পরিচালিত এই অভিযানে শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় শুধুমাত্র রোবট ও ড্রোনের উপস্থিতিতেই। তার দাবি, ইতিহাসে এটাই প্রথম যেখানে কোনো মানব সেনা ছাড়াই শত্রু অবস্থান দখল ও বন্দি করা হয়েছে।

রোবটই এখন ‘ফ্রন্টলাইন সৈন্য’

বিগত কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের আকাশজুড়ে ড্রোনের উপস্থিতি ব্যাপক হুমকি তৈরি করেছে পদাতিক বাহিনীর জন্য। এর ফলেই ইউক্রেন স্থলভিত্তিক ড্রোন বা রিমোট-নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ব্যবহার শুরু করে।

চাকা বা ট্র্যাকচালিত এসব রোবট শুরুতে আহতদের সরিয়ে নেওয়া, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া ও মাইন অপসারণের কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন এগুলো সরাসরি আক্রমণ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। জিনকেভিচ বলেন, ‘আমরা কখনোই সংখ্যায় রাশিয়ার সমান হতে পারব না। তাই প্রযুক্তির মাধ্যমেই আমাদের এগিয়ে থাকতে হবে।’

স্থল ড্রোনগুলো বড় সামরিক যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি গোপনীয়ভাবে চলতে পারে এবং সনাক্ত করা কঠিন। আকাশের ড্রোনের তুলনায় এগুলো সব ধরনের আবহাওয়ায় কাজ করতে সক্ষম এবং অনেক বেশি ওজন বহন করতে পারে। এছাড়া এগুলো বেশি টেকসই এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে বলে দাবি তার।

গত বছরের শেষ দিকে ইউক্রেনের থার্ড আর্মি কর্পস জানায়, একটি মেশিনগান-সজ্জিত স্থল রোবট টানা ৪৫ দিন রুশ বাহিনীর অগ্রগতি ঠেকিয়ে রেখেছিল। এই সময়ে কেবল হালকা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত চার্জ দিলেই সেটি কার্যকর ছিল। হাজারো প্রাণ রক্ষা ইউক্রেনের লক্ষ্য, চলতি বছরের মধ্যে তাদের এক-তৃতীয়াংশ পদাতিক বাহিনীকে রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনেস্কি সিএনএনকে জানিয়েছেন, গত তিন মাসে ২২ হাজারেরও বেশি মিশনে ড্রোন ও রোবট ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকায় একজন সৈনিকের পরিবর্তে রোবট পাঠিয়ে ২২ হাজারের বেশি জীবন রক্ষা করা হয়েছে।’

ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের স্থল যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ রবার্ট টোলাস্ট বলেন, এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করবে। তার মতে, স্থল ড্রোন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনো এলাকা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, তবে আহত সরিয়ে নেওয়া, সরবরাহ পৌঁছানো, মাইন অপসারণ এবং যুদ্ধ পরিচালনায় এগুলো ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন ড্রোন ও রোবোটিক প্রযুক্তিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। জানুয়ারিতে মিখাইলো ফেদোরভকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের পর এই খাতে আরো গতি আসে। তিনি প্রযুক্তি ও ডেটা-নির্ভর একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা চালু করেন, যার লক্ষ্য রাশিয়াকে শান্তির পথে বাধ্য করা।

এই পরিকল্পনায় শত শত কম্পানি ড্রোন উন্নয়ন ও উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে সামনের সারির পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা রোবটের মাধ্যমে পরিচালনা করা। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন বর্তমানে ড্রোন ব্যবহারে স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছে, যা রুশ অগ্রযাত্রা ধীর করে দিয়েছে এবং পাল্টা আক্রমণে সহায়তা করছে।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে এখনো সতর্কতা রয়েছে ইউক্রেন। জিনকেভিচ বলেন, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় মানুষেরই হওয়া উচিত। আমরা কি অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে ছেড়ে দিতে পারি?’ তিনি আরো বলেন, ‘মানুষের জীবন অমূল্য, কিন্তু রোবট রক্ত ঝরায় না। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে রোবোটিক প্রযুক্তির দ্রুত ও ব্যাপক উন্নয়ন জরুরি।’

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..