✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৯, | ১৪:৩৮:০৩ |নিয়মিত উড়োজাহাজে যাতায়াতকারী বিমানবালা ও পাইলটদের জন্য আকাশে কাটানো মুহূর্ত হয়তো রোমাঞ্চকর, কিন্তু এই পেশার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের তুলনায় উড়োজাহাজের চালক ও কেবিন ক্রুরা তেজস্ক্রিয়তা বা মহাজাগতিক বিকিরণজনিত কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকরা প্রায় ৫০৩টি বিভিন্ন পেশার ওপর দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন।
গবেষণাটির জন্য ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণকারী প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের মৃত্যুসনদের তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, তেজস্ক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর হারের দিক থেকে সমস্ত পেশাকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থানে রয়েছেন কেবিন ক্রু বা বিমানবালারা এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন উড়োজাহাজের পাইলটরা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত পারমাণবিক চিকিৎসা খাতের কর্মীদের চেয়েও আকাশপথে কর্মরত কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ ধরনের ক্যানসারে মৃত্যুর অনুপাত অনেক বেশি। উপাত্ত অনুযায়ী, অন্যান্য সাধারণ পেশার তুলনায় বিমানবালাদের তেজস্ক্রিয়তাজনিত ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি, অন্যদিকে পাইলটদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির পরিমাণ প্রায় ৩৬ শতাংশ। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, সাধারণ বা তেজস্ক্রিয়তাহীন অন্যান্য ক্যানসারের ক্ষেত্রে আকাশপথের কর্মীদের ঝুঁকির হার গড়পড়তা মানের কাছাকাছিই রয়েছে।
এই উদ্বেগের মূল কারণ হিসেবে গবেষকরা বায়ুমণ্ডলের উচ্চতায় অবস্থানকারী মহাজাগতিক বিকিরণ কসমিক রেডিয়েশন-কে চিহ্নিত করেছেন। পৃথিবী পৃষ্ঠে বায়ুমণ্ডল আমাদের মহাকাশ থেকে আসা উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বাণিজ্যিক উড়োজাহাজগুলো যে উচ্চতায় চলাচল করে, সেখানে বায়ুমণ্ডলের এই প্রতিরক্ষামূলক স্তরটি অনেকটাই পাতলা হয়ে আসে। ফলে বিমানে অবস্থানরত ব্যক্তিরা সরাসরি এই বিকিরণের সান্নিধ্যে আসেন। একজন ক্রু সদস্যের বার্ষিক বিকিরণ গ্রহণের পরিমাণ নির্ভর করে তাদের ফ্লাইটের সময়সূচি, গন্তব্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। হিসাব অনুযায়ী, বছরে ১০ বার দীর্ঘ দূরত্বের বিমান ভ্রমণকারী একজন সাধারণ যাত্রী যেখানে প্রায় ০.৪ মিলিসিভার্ট বিকিরণ গ্রহণ করেন, সেখানে পেশাদার এয়ারক্রু সদস্যরা প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৬ মিলিসিভার্ট পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসেন, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
অবশ্য এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করে না যে মহাজাগতিক বিকিরণই নিশ্চিতভাবে এই ক্যান্সারের একমাত্র কারণ। গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে কসমিক রেডিয়েশন ছাড়াও উড়োজাহাজের জানোলা দিয়ে প্রবেশ করা ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি এবং নাইট শিফট বা অনিয়মিত কর্মঘণ্টার কারণে স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়গুলোও শরীরবৃত্তীয় ক্ষতি করতে পারে।
তবে এই ফলাফল স্পষ্টভাবেই বিশ্বজুড়ে এয়ারক্রু সদস্যদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন বিমান কর্মীদের তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিতে থাকা পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও দেশটির এয়ারক্রু সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিকিরণ মাত্রা নির্ধারণ বা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। যা অন্যান্য দেশ কিংবা পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মীদের নিরাপত্তার নিয়মের একেবারেই বিপরীত। সার্বিক বিবেচনায় গবেষকরা বিমান কর্মীদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত উপযুক্ত নীতিমালা তৈরি, সার্বক্ষণিক বিকিরণ মাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর জোর তাগিদ দিয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি