✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৯, | ০১:৪২:৩৭ |ইয়েমেনের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখা একসময় বিশ্বজুড়ে সুস্বাদু কফির রফতানি ও স্থানীয় জেলেদের শান্ত জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত ছিল। এখন সেই নগরী ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় শহরটি এখন আর স্থানীয় মাছ শিকারিদের কলতানে মুখরিত নয়। শহরের অলিগলিতে এখন আর তাদের আঞ্চলিক উপভাষা শোনা যায় না বরং গোটা শহরজুড়ে প্রাধান্য বিস্তার করেছে হুতিদের হাত থেকে পালিয়ে আসা অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের কণ্ঠস্বর। ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০১৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক বন্দরটি ২০২১ সালে তারেক সালেহের নেতৃত্বে ‘রিপাবলিকান গার্ড’ পুনরায় চালু করে। তবে সাবেক এই বিশেষ সামরিক বাহিনীর সদর দফতর গড়ে ওঠার পর থেকেই মোখার সাধারণ বেসামরিক জীবন চিরতরে বদলে গেছে।
লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় মোখার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণেই গত দুই সপ্তাহে শহরটি হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত এক সপ্তাতেই মোখা বন্দরে ২৫টিরও বেশি আক্রমণ চালিয়েছে হুতিরা। যদিও হুতি যোদ্ধাদের দাবি, তারা কেবল সামরিক অবস্থান ও সেনা পুনঃবিন্যাসের স্থানগুলোতে আঘাত হানছে, বাস্তবে বেসামরিকদের ওপর এর প্রভাব পড়েছে ভয়াবহভাবে। সাম্প্রতিক এক শুক্রবারের হামলাই প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন সাধারণ মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২২ জন। এই তীব্র আকস্মিক বাড়তে থাকা সহিংসতা গোটা এলাকার পরিবেশকে আতঙ্কের চাদরে ঢেকে দিয়েছে।
ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে মখায় বসবাসরত রিপাবলিকান গার্ডের যোদ্ধারাও এখন নিজেদের পরিবারকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যে সকল যোদ্ধারা উচ্চ বেতনের আশায় হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছেড়ে রিপাবলিকান গার্ডে যোগ দিয়েছিলেন, তারা এখন তাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের তাইজ বা লাহজের দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। কারণ হুতিরা বেসামরিক এলাকা ও সামরিক ঘাঁটির মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। ফলে অতীতে শান্ত পরিবেশ দেখে মখায় পরিবার নিয়ে আসা অনেক যোদ্ধাই এখন পুনরায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর ফলে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে হঠাৎ করেই বাড়ি ভাড়ার চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং নতুন করে এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।
সংঘাতের এই মারাত্মক রূপ মোখার আদি অধিবাসী ও জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় স্থানীয় হাজার হাজার জেলে এখন বেকার। ক্ষুব্ধ স্থানীয়দের মতে, বহিরাগত যোদ্ধারা তাদের শহরের শান্তি কেড়ে নিয়েছে এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী উপার্জনের মাধ্যমগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। লোহিত সাগরের যে নীল জলরাশি একসময় পরিবারের ভরণপোষণের উৎস ছিল, তা আজ এক রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। এমনকি বন্দরের কাজকর্ম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দেড় হাজারের বেশি বন্দর শ্রমিক এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
যদিও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার উপস্থিতি এবং কিছু নতুন বিনিয়োগ শহরটিকে আধুনিক রূপ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে সব উন্নয়নই এখন ম্লান হতে বসেছে। সাধারণ নাগরিক এবং পেশাজীবীদের একমাত্র আকুল আকুতি; অবকাঠামো ও বেসামরিক মানুষের ওপর যেন এসব ধ্বংসাত্মক হামলা অবিলম্বে বন্ধ হয়। তবে প্রতিদিন আকাশ থেকে বর্ষিত হতে থাকা গোলা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীর নিচে দাঁড়িয়ে মখার বাসিন্দারা কেবল তাদের হারানো শান্তিময় দিনগুলোর কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
সূত্র: মিডলইস্ট আই