নেসলের চীনে কার্যক্রমের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯০৮ সালে সাংহাইয়ে প্রথম অফিস খোলার পর কোম্পানিটি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনা বাজারে প্রবেশের একটি মডেল তৈরি করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে আধুনিক দুগ্ধশিল্প গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কোম্পানি। অস্ট্রেলিয়া থেকে গরু এনে উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনে ব্যবসা করছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠান নেসলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটিতে কোম্পানিটির কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এর কারণ হলো বাজারে অতিরিক্ত পণ্য, ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, ভোক্তা চাহিদা হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট। খবর এফটি।
২০১৮ সাল থেকে চীনের হেবেই প্রদেশে নেসলের ডিস্ট্রিবিউটর ফেং লিকিং। তার প্রায় ১০০ বর্গমিটারের একটি গুদাম ভর্তি হয়ে আছে নেসলের বিক্রীত শিশুখাদ্য ও গুঁড়োদুধে। ফেং অভিযোগ করেন, বাজারে চাহিদা না থাকলেও কোম্পানি তাকে অতিরিক্ত পণ্য কিনতে চাপ দিয়েছিল। তার দাবি, নির্দেশ না মানলে ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে বাদ পড়ার ভয় ছিল।
২০২২ সালে নেসলের সঙ্গে ফেং লিকিংয়ের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এর পর তিনি বেইজিংয়ে কোম্পানির অফিসে গিয়ে অবিক্রীত পণ্যের জন্য ফেরত অর্থ দাবি করেন। তার হিসাবে প্রায় ১০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ডলার) এখনো পাওনা। ফেং বলেন, ‘খরচ বাড়ছে, ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। এভাবে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়।’
ফেং একা নন। চীনের আরো কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটর অভিযোগ করেছেন, অবিক্রীত পণ্যের জন্য কোম্পানি তাদের অর্থ ফেরত দেয়নি। নেসলের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ‘চ্যানেল স্টাফিং’ শীর্ষক একটি বিতর্কিত ব্যবসায়িক কৌশল, যেখানে কোম্পানি নিজেদের বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে বাজারের চাহিদার চেয়ে বেশি পণ্য সরবরাহ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক পশ্চিমা কোম্পানির জন্যই চীনে ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, একই সঙ্গে ভোক্তা ব্যয়ের গতি কমেছে। নেসলের ক্ষেত্রে জন্মহার কমে যাওয়াও বড় প্রভাব ফেলেছে, কারণ এতে শিশুখাদ্যের চাহিদা কমে গেছে
নেসলের চীনে কার্যক্রমের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯০৮ সালে সাংহাইয়ে প্রথম অফিস খোলার পর কোম্পানিটি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনা বাজারে প্রবেশের একটি মডেল তৈরি করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে আধুনিক দুগ্ধশিল্প গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কোম্পানি। অস্ট্রেলিয়া থেকে গরু এনে উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল।
তবে গত এক দশক নেসলের জন্য সহজ ছিল না। গ্রেটার চায়না অঞ্চল কোম্পানির মোট আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ হলেও, এটি এখন সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্সের বাজারে পরিণত হয়েছে। গত বছর এ অঞ্চলে বিক্রি ১০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে এবং গত সাত বছরের মধ্যে ছয় বছরই বিক্রি কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক পশ্চিমা কোম্পানির জন্যই চীনে ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, একই সঙ্গে ভোক্তা ব্যয়ের গতি কমেছে। নেসলের ক্ষেত্রে জন্মহার কমে যাওয়াও বড় প্রভাব ফেলেছে, কারণ এতে শিশুখাদ্যের চাহিদা কমে গেছে।
এর মধ্যেই কোম্পানির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। ২০২৪ সালে প্রধান নির্বাহী মার্ক শ্নাইডারকে সরিয়ে দেন চেয়ারম্যান পল বুলকে। তার উত্তরসূরি লরাঁ ফ্রেইক্স এক বছর পর ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির কারণে পদচ্যুত হন। পরবর্তীতে শেয়ারহোল্ডারদের সমালোচনার মুখে বুলকেও সরে দাঁড়াতে হয়।
মূল্য নির্ধারণেও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। জিয়াংসু প্রদেশের ডিস্ট্রিবিউটর ফ্যান বলেন, অনলাইনে যেখানে একটি গুঁড়োদুধের দাম ৬০ ইউয়ান, সেখানে নেসলে তাদের কাছে ৮৯ ইউয়ানে বিক্রি করতে চেয়েছে। ‘এভাবে কি বিক্রি সম্ভব?’—প্রশ্ন তার
চীনের বাজারে এ অস্থিরতার মধ্যেই চ্যানেল স্টাফিং ব্যাপক আকার ধারণ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোম্পানি কয়েকশ ডিস্ট্রিবিউটরের পরিবর্তে কয়েক হাজার ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে কাজ শুরু করে, ফলে নিয়ন্ত্রণ আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত পণ্য সরবরাহের ফলে স্বল্পমেয়াদে বিক্রির পরিসংখ্যান ভালো দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয়নি।
একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা খুব সহজ উপায়। এতে টার্গেট পূরণ করা যায়, বোনাস পাওয়া যায়। কিন্তু একই সঙ্গে ভোক্তা চাহিদা তৈরি না করলে শেষ পর্যন্ত সমস্যা হবেই।’
এ অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে ডিস্ট্রিবিউটররা বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে শুরু করেন, যা ব্র্যান্ডের মূল্যও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ডিস্ট্রিবিউটরদের অভিযোগ, আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবিক্রীত পণ্য ফেরত দিলে কোম্পানি অর্থ ফেরত দিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে বা অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। হেবেইয়ের আরেক ডিস্ট্রিবিউটর সু জানান, তিনি একাধিকবার বেইজিংয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। একবার তো পুলিশের সাহায্যও নিতে হয়েছে। কারণ যার সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন, তিনি দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
এছাড়া মূল্য নির্ধারণেও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। জিয়াংসু প্রদেশের ডিস্ট্রিবিউটর ফ্যান বলেন, অনলাইনে যেখানে একটি গুঁড়োদুধের দাম ৬০ ইউয়ান, সেখানে নেসলে তাদের কাছে ৮৯ ইউয়ানে বিক্রি করতে চেয়েছে। ‘এভাবে কি বিক্রি সম্ভব?’—প্রশ্ন তার।
বর্তমানে নতুন নেতৃত্বের অধীনে নেসলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। কোম্পানির চীনপ্রধান কাইস মারজুকি ডিস্ট্রিবিউটরের সংখ্যা কমিয়েছেন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো নিয়ন্ত্রিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে আগে ভোক্তা চাহিদা তৈরি করে পরে পণ্য সরবরাহের কৌশলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এখন শক্তিশালী ব্র্যান্ডগুলোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবসাকে পুনর্গঠন করছে। নেসলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের মাঝামাঝি নাগাদ সরবরাহ চেইনে জমে থাকা অতিরিক্ত স্টক স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে বলে তারা আশা করছে।
এ জাতীয় আরো খবর..