✕

সর্বশেষ :
মদিনা-জেদ্দার পথই এখন সৌদি আরবগামী যাত্রীদের ভরসা আর্জেন্টিনায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় ভবন দখল সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় কঠোরতা প্রশাসনের বিশ্বকাপে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর কঠোর নিয়ম আনছে ফিফা ইরানি স্লিপার সেলের ভয়ে ছিল আমিরাত? দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ডিএমপি: কমিশনার তিন বিভাগে বৃষ্টির আভাস আশঙ্কাজনক হারে গলছে ‘ডুমসডে গ্ল্যাসিয়ার’, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে বিশ্ব ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল নেভাতে গিয়ে চারজনের মৃত্যু দেশের ২৭২৭ পূজামণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন, দুর্গম এলাকায় ২১ বেস ক্যাম্প

আশঙ্কাজনক হারে গলছে ‘ডুমসডে গ্ল্যাসিয়ার’, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে বিশ্ব

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৬, | ১৪:৫৩:৫৭ |

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানতেন যে অ্যান্টার্কটিকার বিখ্যাত ডুমসডে গ্ল্যসিয়ার ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক তথ্য, যে হারে এটি গলবে বলে পূর্বে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি ‘আক্রমণাত্মক’ বা দ্রুত গতিতে গলছে এই বরফের বিশাল স্তূপ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন একদল প্রথিতযশা হিমবাহ বিশেষজ্ঞ।

বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত এই হিমবাহটি নিয়ে যেকোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা বিজ্ঞানীদের জন্য বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এই ফ্লোরিডা-আকারের বিশাল হিমবাহটি গত কয়েক দশক ধরেই ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং বর্তমানে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এর অবদান প্রায় চার শতাংশ। তবে এর গলনের পেছনের প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত জটিল হওয়ায় ভবিষ্যতে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। তা সত্ত্বেও, এর সঠিক গতিপ্রকৃতি জানা অত্যন্ত জরুরি, কারণ পুরো হিমবাহটি যদি পুরোপুরি ধসে পড়ে, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই ফুটেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। শুধু তা-ই নয়, এই হিমবাহটি আন্টার্কটিক বরফের বিশাল চাদরকে আটকে রাখার জন্য একটি প্লাগ বা ছিপির মতো কাজ করে। ফলে থওয়েটস ভেঙে পড়লে তা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট বাড়িয়ে দিতে পারে, যা মায়ামি থেকে শুরু করে ম্যানিলার মতো বহু উপকূলীয় অঞ্চল ও মানববসতিকে পানির নিচে তলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইন এবং নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ‘আইস শিট মডেল’ তৈরি করেছেন, যা এই বরফ দানবের তলদেশে আসলে কী ঘটছে তা আরও নিখুঁতভাবে তুলে ধরে। থওয়েটসের এই দ্রুত সংকুচিত হওয়ার মূল কারণ হলো এর ‘গ্রাউন্ডিং লাইন’-এর প্রক্রিয়া। গ্রাউন্ডিং লাইন হলো সেই নির্দিষ্ট বিন্দু যেখানে হিমবাহটি সমুদ্রের তলদেশ থেকে ওপরে উঠে পানির ওপর ভেসে থাকতে শুরু করে। প্রচলিত বরফের মডেলগুলোতে এই গ্রাউন্ডিং লাইনকে একটি নির্দিষ্ট এবং মোটামুটি স্থিতিশীল রেখা হিসেবে দেখা হতো। তবে রিপোর্টের প্রধান লেখক এবং বর্তমানে ইউসিএলএ-র প্রজেক্ট বিজ্ঞানী ম্যাটিয়া পোইনেলি জানান, সমুদ্রের সাথে যুক্ত পৃথিবীর প্রধান হিমবাহগুলোর তলদেশে প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন একটি ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রাউন্ডিং লাইনটি কোনো একক স্থির রেখা নয় বরং এটি মাইলজুড়ে বিস্তৃত একটি ‘গ্রাউন্ডিং জোন’। জোয়ার-ভাটার সময় এই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢোকে এবং বের হয়। ‘টাইডাল পাম্পিং’ নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ায় বিশাল বরফের স্তর বারবার ওপরে ওঠে এবং নিচে নামে। এর ফলে তুলনামূলকভাবে গরম সমুদ্রের পানি হিমবাহের তলদেশের গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পায় এবং ভেতরে মারাত্মক গলন সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞানীরা যখন তাদের মডেলে এই গ্রাউন্ডিং জোনের ধারণাটি অন্তর্ভুক্ত করেন, তখন এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। বিখ্যাত ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নতুন করে আর না বাড়লেও, কেবল এই গলন প্রক্রিয়ার কারণেই ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১.২ ইঞ্চি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা আগের সমস্ত পূর্বাভাসের চেয়ে দ্বিগুণ।

যে মাটির ওপর থওয়েটস হিমবাহটি দাঁড়িয়ে আছে, তা ভেতরের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। ফলে বরফ যত গলছে, ভেতরের বরফ তত বেশি সমুদ্রের উষ্ণ পানির সংস্পর্শে আসছে। তবে সমুদ্রতলের দুটি পানির নিচের শৈলশিরা এই প্রক্রিয়াকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করে বরফকে আটকে রেখেছে। কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, গ্রাউন্ডিং জোনের অব্যাহত গলন বরফকে এই শৈলশিরাগুলো থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। বিশেষ করে ‘মুগিনোট রিজ’ নামক একটি বড় শৈলশিরা থেকে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বরফ আলাদা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ। আর একবার এটি ঘটে গেলে হিমবাহটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঢালু তলদেশ বেয়ে পরবর্তী শৈলশিরার দিকে পিছলে যাবে।

যদিও ১.২ ইঞ্চি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুনতে খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে, তবে উপকূলীয় জনপদের জন্য বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই সংখ্যাটিই যথেষ্ট। গবেষণার অন্যতম লেখক এবং ইউসি ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইন-এর আর্থ সিস্টেম সায়েন্সের অধ্যাপক এরিক রিগনট সতর্ক করে বলেছেন যে, আগামী দশকগুলোতে উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি হতে যাচ্ছে। ইউনিভার্সিসি অব কলোরাডো বোল্ডারের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিজ্ঞানী টেড স্ক্যামবোস (যিনি এই গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না) এই ফলাফলকে থওয়েটস থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের মোড় ঘোড়ানো আবিষ্কার হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তবে এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীতে পৌঁছাতে হলে হিমবাহের তলদেশ থেকে সরাসরি বাস্তব উপাত্ত সংগ্রহ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ আন্টার্কটিক সার্ভেশনের সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিদ রবার্ট লার্টার জানান, প্রজেক্টে যা বর্ণনা করা হয়েছে বাস্তব পরিস্থিতি তারচেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং নিশ্চিত তথ্য পেতে আমাদের আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে থওয়েটসের সেই দুর্গম গ্রাউন্ডিং জোনে গিয়ে সরাসরি উপাত্ত সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অধ্যাপক রিগনট জানিয়েছেন, ২০২৮ সালে বিজ্ঞানীরা সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন যাতে সমুদ্রের পানির আসা-যাওয়া এবং ভেতরের গলন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো উপযুক্ত যন্ত্র স্থাপন করা যায়। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংবেদনশীল এই বরফের স্তরগুলো কতটা হুমকিতে রয়েছে তা আমরা বহু বছর ধরেই জানি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থওয়েটসের তলদেশে আসলে কী ঘটছে তা যত বেশি উন্মোচিত হচ্ছে, বিজ্ঞানীদের মনে আতঙ্ক ও উদ্বেগের মাত্রা ততই বাড়ছে। পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে হবে; তবে রিগনট স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে, তার জের ধরে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই আমাদের সহ্য করতে হবে।

সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..