✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৭, | ২২:৫৫:৪৭ |ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে দখলদার ভূখণ্ডটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি একটি বিতর্কিত বিলবোর্ড প্রচারণা শুরু করেছে। এতে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের পাশে রাখা হয়েছে।
বিলবোর্ডে চারজনের ছবির নিচে লেখা হয়েছে, “তারা নেতানিয়াহুকে হারাতে চায়, তাদের জিততে দেবেন না।”
লিকুদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই প্রচারণা ইতোমধ্যে ইসরায়েলের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী রাজনীতিকেরা বিলবোর্ডটির ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ প্রকাশ করে নেতানিয়াহু ও তার দলের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
তেল আবিবে বিলবোর্ড
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, বিলবোর্ডটি জেরুজালেমে স্থাপন করা হয়েছে। তবে পরে জানা গেছে, লিকুদের বিলবোর্ডটি আসলে তেল আবিবে, আয়ালন মহাসড়কের ওপর স্থাপন করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে বিলবোর্ডটির একটি ছবি পুনঃপ্রকাশ করেছেন। ছবির সঙ্গে তিনি লিখেছেন, “তাদের জিততে দেবেন না।”
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে লিকুদের এই প্রচারণা ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামদানিকে কেন ‘বিরোধী’ শিবিরে রাখা হলো?
মামদানিকে খামেনি, এরদোয়ান ও নাঈম কাসেমের সঙ্গে একই সারিতে রেখে লিকুদ কার্যত বোঝাতে চেয়েছে যে, নেতানিয়াহুর পরাজয় কামনা করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক শক্তি একই স্বার্থে একত্র হয়েছে।
তবে মামদানিকে ইরান বা হিজবুল্লাহর নেতাদের সঙ্গে একই ফ্রেমে রাখার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের মেয়র মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার স্পষ্ট অবস্থানের কারণে ইতোমধ্যে আলোচিত ও বিতর্কিত একটি রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। লিকুদের প্রচারণায় তাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শক্তিগুলোর সঙ্গে একই কাতারে তুলে ধরা হয়েছে।
পাল্টা বিলবোর্ডে বিরোধীদের ব্যঙ্গ
লিকুদের প্রচারণা প্রকাশের পরপরই কয়েকজন ইসরায়েলি রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দল একই ধরনের বিলবোর্ডের ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ প্রকাশ করেন।
সাবেক ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বা আইডিএফের প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন দল ইয়াশার একটি পাল্টা বিলবোর্ড প্রকাশ করেছে।
তাদের সংস্করণে লেখা হয়েছে, “তারা আইডিএফকে ধ্বংস করতে চায়, নেতানিয়াহুকে জিততে দেবেন না।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটির সঙ্গে দলটি লিখেছে, “নেতানিয়াহু, আমরা আপনার জন্য ঠিক করে দিয়েছি।” এরপর বলা হয়, “শুধু আইজেনকোটই একটি পুরোপুরি জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন।”
এভাবে লিকুদের প্রচারণার ভাষা ব্যবহার করেই বিরোধীরা নেতানিয়াহুর সামরিক ও রাজনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছে।
‘কাতারগেট’ টেনে পাল্টা আক্রমণ
আরেকটি ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য নাআমা লাজিমি।
তিনি লিকুদের বিলবোর্ডের একই নকশা ব্যবহার করে সেখানে চারজনের ছবি বসিয়েছেন। তারা হলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি, নেতানিয়াহুর সাবেক কৌশলগত উপদেষ্টা ইয়োনাতান উরিখ, নেতানিয়াহুর সাবেক নিরাপত্তাবিষয়ক মুখপাত্র এলি ফেল্ডস্টেইন এবং নেতানিয়াহুর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা শ্রুলিক আইনহর্ন।
এই চারজনের নামই ‘কাতারগেট’ নামে পরিচিত একটি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও তদন্তের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
লাজিমির সংস্করণে মূল বিলবোর্ডের বক্তব্যও উল্টে দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, “তারা নেতানিয়াহুকে জেতাতে চায়, তাদের হারতে দেবেন না।”
পোস্টের ক্যাপশনে লাজিমি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে লেখেন, “নেতানিয়াহু, আমি এটিকে আপনার জন্য কাতারগেট সংস্করণে আপডেট করে দিলাম।”
এর সঙ্গে তিনি ব্যঙ্গ করে আরও লেখেন, “বিলটি ৭ অক্টোবর জমা দেওয়া হবে।”
কী এই ‘কাতারগেট’?
‘কাতারগেট’ নামে পরিচিত এই ঘটনা নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে ঘিরে চলমান তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অভিযোগ রয়েছে, নেতানিয়াহুর কয়েকজন সহযোগী কাতারের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন, যখন তারা হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের মুক্তি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এই অভিযোগ ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিদেশি অর্থের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তার সরকারের স্বচ্ছতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
লাজিমির পাল্টা বিলবোর্ডে এই ইস্যুকে সামনে এনে মূলত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের পুরোনো অভিযোগগুলোই নতুন করে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ করা হয়েছে।
নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে আইজেনকোট
ইসরায়েলে পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল ২৪টি আসন নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২২টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন বি’ইয়াখাদ ১৫টি আসন পাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
ফলে নির্বাচনী মাঠে নেতানিয়াহুর লিকুদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর দল প্রচারণায় শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকেও যুক্ত করছে। মামদানি, খামেনি, এরদোয়ান ও নাঈম কাসেমকে একই বিলবোর্ডে তুলে ধরা তারই একটি উদাহরণ।
নির্বাচন যত এগোবে, প্রচারণার লড়াইও বাড়বে
লিকুদের বিলবোর্ডের পাল্টা সংস্করণগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রচারণা এখন শুধু নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ করা, বিতর্কিত ইস্যু সামনে আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করাও নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহু ও তার সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরেই তাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। বিপরীতে বিরোধীরা তার দীর্ঘ শাসন, যুদ্ধনীতি, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে সামনে আনছে।
ফলে আসন্ন নির্বাচন শুধু কে কতটি আসন পাবে- সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্য কতটা টিকে থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
লিকুদের সাম্প্রতিক বিলবোর্ড এবং তার জবাবে বিরোধীদের ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা সেই উত্তপ্ত নির্বাচনী লড়াইয়েরই একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন। সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট