সর্বশেষ :
স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে দেশের প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্ব পালনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ডলফিনের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড চীন, সরানো হলো ১০ লাখের ‍অধিক মানুষ ইরান ইস্যুতে কার্টারের মতোই ফাঁদে পড়েছেন ট্রাম্প! আইসিসির ‘প্লেয়ার অফ দ্য মান্থ’ পুরস্কারের তালিকায় তানজিদ হরমুজ খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাংলা কিউআর কোডে লেনদেন হবে ফ্রি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি : রিজভী আইসিসির সেরা ক্রিকেটারদের তালিকায় ম্যাথিউস-হারশিতা ও সিভার রদ্রিকে দলে ভেড়াতে মরিয়া বার্সেলোনা, অনিশ্চিত ডি ইয়ংয়ের ভবিষ্যৎ এশিয়ার তেলের বাজারের ‘ইরান-ধাক্কা’ একাই সামলে দিচ্ছে চীন

সুন্দর উপদেশের প্রয়োজনীয়তা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-২৫, | ১৪:০৫:৪৭ |

সুন্দর উপদেশ (মাওয়িজাহ হাসানাহ) মানুষের হূদয়কে জাগ্রত করার, গাফিলতি থেকে সতর্ক করার এবং অন্তরের সংশোধন ও রোগ নিরাময়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এটি সত্কাজের আদেশ ও অসত্কাজ থেকে নিষেধ করার সেই মহান দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে উত্সাহ ও সতর্কতার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা হয় এবং কল্যাণকর নসিহত করা হয়। এর ফলস্বরূপ হূদয় কোমল হয়, অন্তর বিনয়ী হয় এবং মানুষ ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এবং কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ লাভের আশায় সত্কর্মের দিকে অগ্রসর হয়।

সুন্দর উপদেশ দুইভাবে গ্রহণ করা যায়—
প্রথমত, শ্রবণের মাধ্যমে অর্থাত্ হিদায়াত, সঠিক পথ ও কল্যাণকর নসিহত শোনা, পড়া ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া, যা নবী-রাসুলদের বাণী এবং তাঁদের প্রতি তাঁদের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহির মাধ্যমে এসেছে। একইভাবে দ্বিন ও দুনিয়ার কল্যাণে প্রত্যেক সত্ উপদেশদাতা ও পথপ্রদর্শকের কাছ থেকেও উপকৃত হওয়া।

দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্থাত্ পৃথিবীর বিভিন্ন নিদর্শন, ঘটনা, অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি, তাকদীরের বিধান এবং বিশ্বজগতের ওপর আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো দেখে চিন্তা-ভাবনা করা এবং শিক্ষা গ্রহণ করা।

হূদয়ের জন্য উপদেশের প্রয়োজনীয়তা জ্ঞান ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কম নয়; বরং এটি জ্ঞান অর্জনের পথকে সহজ করে দেয়। যখন হূদয় কোমল হয়, তখন তা উপকারী জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। ফলে আত্মা প্রশান্তি লাভ করে, মন শান্ত হয়, বিবেক পুষ্ট হয় এবং হূদয় স্থিরতা অর্জন করে।

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কোরআনকে ‘মাওয়িজাহ বা উপদেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ নাজিল করেছি।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ৩৪)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন : ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং অন্তরে যা আছে তার জন্য আরোগ্য, আর মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৭)

কোরআনের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া হলো হূদয় কোমল করার সর্বোত্তম, সহজতম, নিকটতম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম। কারণ পুরো কুরআনই এক মহান উপদেশ। আল্লাহ তাআলা নবী (সা.)-এর দাওয়াতের অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে সুন্দর উপদেশকে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে এমন পদ্ধতিতে বিতর্ক করো যা সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই তোমার রবই ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সঠিক পথে রয়েছে।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত : ১২৫)

দাওয়াত গ্রহণকারীর অবস্থা অনুযায়ী পদ্ধতি ভিন্ন হয়। কেউ যদি সত্যের সন্ধানী ও আগ্রহী হয়, তাকে প্রজ্ঞার মাধ্যমে আহ্বান করা হয়। কেউ যদি উদাসীন ও গাফিল হয়, তবে তার জন্য প্রজ্ঞার সঙ্গে সুন্দর উপদেশ প্রয়োজন। আর কেউ যদি জেদি ও বিরোধিতাকারী হয়, তবে তার সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করতে হয়।

আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সা.)-কে উপদেশ ও স্মরণ করানোর দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন :
‘তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাদের উপদেশ দাও এবং তাদের অন্তরে প্রভাব বিস্তারকারী কথা বলো।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৬৩)
সুন্দর উপদেশের সৌন্দর্য দুটি বিষয়ে নির্ভর করে—

১. উপযুক্ত সময়ে প্রদান করা : যেমন দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টি আসে; কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টি যেমন জমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত উপদেশও মানুষের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে।

২. পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত উপদেশগুলোর মধ্যে আরবাজ ইবন সারিয়া (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস অন্যতম। তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন এক উপদেশ দিলেন, যার ফলে আমাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠল এবং চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল।’

এটি আল্লাহর এই বাণীর বাস্তব প্রতিফলন—‘আল্লাহকে যারা ভয় করে তাদের শরীর তা থেকে কেঁপে ওঠে, অতঃপর তাদের দেহ ও হূদয় আল্লাহর স্মরণের দিকে কোমল হয়ে যায়।’ (সুরা আজ-জুমার, আয়াত : ২৩)

সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! মনে হচ্ছে এটি বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ। আমাদের কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি এবং শ্রবণ ও আনুগত্যের।’ (হাদিস)

তাই যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দেন, শিক্ষক, প্রশিক্ষক, লেখক এবং আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ করা ব্যক্তিদের উচিত সংক্ষিপ্ত অথচ হূদয়স্পর্শী উপদেশ প্রচার করা। কখনো একটি সত্য ও আন্তরিক কথা আল্লাহর অনুমতিতে একটি মৃতপ্রায় হূদয়কে জীবিত করে দিতে পারে। তাই কল্যাণকর কথা বলতে কৃপণতা করা উচিত নয়।

বর্তমানে যারা নাস্তিকতার বিভিন্ন সন্দেহ ও সংশয় প্রচার করে, তাদের অনেকের সমস্যার মূলও হূদয়ের গাফিলতি ও অন্তরের আবরণ। তাই তাদের সঙ্গে যুক্তি-তর্কের আগে হূদয়কে উপদেশের মাধ্যমে প্রস্তুত করা অধিক কার্যকর হতে পারে। কারণ উপদেশ সফল হলে তা সত্য গ্রহণের পথে বাধা দূর করে।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, যে যুগে উপদেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে যুগেই আন্তরিক উপদেশদাতার সংখ্যা কমে গেছে। এমনকি কেউ কেউ উপদেশকে অবজ্ঞা করে বলেন, এটি কেবল আবেগনির্ভর বক্তব্য, গভীর জ্ঞান বা গবেষণার বিষয় নয়। অথচ জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরও হূদয় কোমল করার জন্য উপদেশের প্রয়োজন আছে।

যদিও কিছু উপদেশদাতার বক্তব্যে দুর্বল কাহিনি, ভিত্তিহীন ঘটনা, মিথ্যা বর্ণনা বা কুসংস্কার প্রবেশ করেছে, তবে এর কারণে উপদেশের মর্যাদা কমে যায় না। বরং প্রয়োজন হলো উপদেশকে বিশুদ্ধ করা, মিথ্যা ও অসত্য থেকে রক্ষা করা এবং সঠিক পদ্ধতিতে তা উপস্থাপন করা। তবে উপদেশ তখনই প্রশংসনীয় যখন তা সত্য, জ্ঞানসম্মত এবং কল্যাণকর হয়।

সুতরাং বর্তমান যুগে সুন্দর উপদেশের প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি। এমন একটি আন্তরিক বাক্য, যা কোনো হূদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়, তা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য বিরাট কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেক জ্ঞানী, শিক্ষক, দাঈ ও কল্যাণকামী মানুষের উচিত হিকমাহ, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মানুষের হূদয়ে উপকারী উপদেশ পৌঁছে দেওয়া।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..