✕


ভারত থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনছে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৫, | ০১:৪০:২৮ |

মধ্য এশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দেশটির তৈরি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনতে যাচ্ছে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের সামরিক সরঞ্জামনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অংশীদার খোঁজার পথে এগোচ্ছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো।

ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং অক্টোবরের শুরুতে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি ‘সাফল্যের গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি আর্মেনিয়া, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানে এই ব্যবস্থা রফতানির কথা তুলে ধরেন।

রাজেশ কুমার সিং বলেন, “আর্মেনিয়া ছিল প্রথম ক্রেতা। দেশটি একাধিক ব্যাটারি কিনেছে। এরপর আমরা তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানেও এটি রফতানি করেছি। উৎপাদন এখন স্থিতিশীল হয়েছে। নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও আমাদের অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ রয়েছে। আমি নিশ্চিত, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও ক্রয়াদেশ আসবে।”

ভারতের প্রতিরক্ষা সচিবের এ বক্তব্যে জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্যও নিশ্চিত হয়েছে। ভারতীয় ব্যবসাবিষয়ক সাময়িকী বিডব্লিউ বিজনেসওয়ার্ল্ড ওই প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার রফতানি গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

এএনআই জানিয়েছে, ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়- উভয় পক্ষই তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানকে আকাশ ব্যবস্থার ক্রেতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ বিষয়ে মধ্য এশিয়ার দেশ দুটি এখনও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি।

আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা
আকাশ ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নকশা ও উৎপাদিত একটি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। শত্রুপক্ষের আকাশযান ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে।

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য আকাশের রফতানি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে দেশটি শুধু নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজস্ব অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির ক্রেতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের জন্য কতটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা বিক্রি হয়েছে, কখন সেগুলো সরবরাহ করা হবে এবং চুক্তির আর্থিক মূল্য কত- এসব বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আর্মেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি থেকে মিলতে পারে ধারণা
তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির বিস্তারিত জানা না গেলেও আর্মেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যায়।

২০২২ সালে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিকস লিমিটেডের (বিডিএল) সঙ্গে ৭২ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করে আর্মেনিয়া। চুক্তিতে কতটি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কেনা হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে এতে ১৫টি অশ্বিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সরবরাহের সময়সূচি পিছিয়ে গেলেও ২০২৪ সালের নভেম্বরে আর্মেনিয়া প্রথম আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি হাতে পায়। ওই ব্যাটারিতে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং একটি রাজেন্দ্র রাডার ছিল বলে জানা যায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় চালান সরবরাহের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

আর্মেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি ও সরবরাহের অভিজ্ঞতা থেকে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশের বাস্তবায়ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে দেশ দুটি ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা কিনছে বা কবে তা হাতে পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তাজিকিস্তানে ভারতের সামরিক যোগাযোগের পুরোনো ইতিহাস
তাজিকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ নতুন নয়। অক্সাস সোসাইটির ২০২৪ সালের অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির সামরিক ক্ষেত্রে ভারতের সম্পৃক্ততার সূচনা ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে। সে সময় তাজিকিস্তানের আইনির বিমানঘাঁটি সংস্কারে ভারত ভূমিকা রেখেছিল।

তবে বিমানঘাঁটিটি সংস্কারের পর তাজিকিস্তান আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেখানে ভারতের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের পরিকল্পনা থেকেও দেশটি সরে আসে। এর পরিবর্তে দুশানবে মস্কোর সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করে, যার আওতায় রুশ বাহিনী ঘাঁটিটি ব্যবহারের সুযোগ পায়।

এছাড়া আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে অবস্থিত ফারখোর বিমানঘাঁটিতে ভারতের প্রবেশাধিকার ছিল। তবে সেখানে ভারতের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি ছিল না।

আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তির আগে ভারত তাজিকিস্তান বা তুর্কমেনিস্তানের কাছে কোনও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন এই রফতানি উদ্যোগ দেশ দুটির সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে মধ্য এশিয়া
মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির বড় অংশ এখনও সোভিয়েত আমলের নকশা অথবা রাশিয়াভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, তুরস্ক, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি সামরিক সরঞ্জামও এ অঞ্চলের বাজারে যুক্ত হচ্ছে। আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ সেই বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে।

তবে ভারত থেকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কেনার ফলে মধ্য এশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে- এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। এর প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তির আকার, সরবরাহের পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপর।

তবু এ উদ্যোগের তাৎপর্য রয়েছে। এটি থেকে বোঝা যায় যে, মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য শুধু রাশিয়ার ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না; তারা নতুন অংশীদার ও বিকল্প সরবরাহপথ খুঁজছে।

নতুন অস্ত্রের সঙ্গে আসবে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
বিভিন্ন দেশের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগের পাশাপাশি কিছু জটিলতাও তৈরি হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইন্টারঅপারেবিলিটি বা আন্তঃকার্যক্ষমতা- অর্থাৎ ভিন্ন দেশ বা প্রযুক্তিতে তৈরি সামরিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারার সক্ষমতা।

রাশিয়া বা সোভিয়েত আমলের রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ভারতীয় প্রযুক্তির সমন্বয় করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কারিগরি ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের কাছে ভারতের আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রফতানির খবর দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টাকেও সামনে এনেছে। তবে চুক্তির পরিমাণ, সরবরাহের সময়সূচি ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ উদ্যোগের প্রকৃত সামরিক প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..