✕


তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি, গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৬, | ১৩:১৬:১৭ |

বিশ্বজুড়ে প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ এবং ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসে কম বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত সাত ধরনের ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রার নানা ত্রুটি ও অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাসের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের অকাল প্রাণহানি ঘটছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার রিসার্চ ফান্ড’ (ডব্লিউসিআরএফ)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় যুক্তরাজ্য (ইংল্যান্ড), যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের ক্যান্সার-সংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, ২০০১ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রায় চার গুণ বেড়েছে। অন্যদিকে অন্ত্র (বাওয়েল), কিডনি ও জরায়ুর ক্যান্সার শনাক্তের হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সব বয়সী মানুষের মধ্যেই ক্যান্সারের হার বাড়ছে। তবে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে এই বৃদ্ধির গতি বা অনুপাত অনেক বেশি। যদিও এখনো ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যেই ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি এবং আক্রান্তদের গড় বয়স ৬০ বছরের ওপরে, তবু তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

যুক্তরাজ্যের কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের ডিজিটাল হেলথের অধ্যাপক ও ট্রান্সলেশনাল ক্যান্সার জিনোমিক্স চেয়ার মার্ক ললার বিষয়টিকে একটি ‘টিকিং টাইম বোমা’ (যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা বোমা) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দ্রুততম সময়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে, অন্যথায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। খারাপ জীবনযাত্রার কারণে যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, সেখানে এই প্রবণতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

কোন দেশে কোন ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি
ইংল্যান্ড: ২০০১ সালে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৫০ বছরের কম বয়সী ১ জন প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হতেন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬ জনে। একই সময়ে তরুণদের অন্ত্রের ক্যান্সারের হার প্রতি লাখে ৩.৯ থেকে বেড়ে ৮.৪-এ পৌঁছেছে। এছাড়া জরায়ু ক্যান্সার প্রতি লাখে ৩.৯ জন এবং কিডনি ক্যান্সার ৩ জনে উন্নীত হয়েছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রতি লাখে ৪২ থেকে বেড়ে ৪৭.৫ জন হয়েছে। পাশাপাশি অগ্ন্যাশয় ও লিভার ক্যান্সারের হারও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র: ২০০০ সাল থেকে সংগৃহীত সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কিডনি ক্যান্সারের হার প্রতি লাখে ২.৫ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৫.৩ জনে পৌঁছেছে, যা দ্বিগুণের বেশি। একই সময়ে অন্ত্র, জরায়ু ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ৫০ শতাংশের বেশি এবং স্তন ক্যান্সার প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নেদারল্যান্ডস: ডাচ রোগীদের তথ্যে ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে অন্ত্র, কিডনি, লিভার এবং জরায়ুমুখের (সার্ভিক্যাল) ক্যান্সারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে বেড়ে চলা স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, প্রক্রিয়াজাত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং পরিবেশগত দূষণ—যেমন রাসায়নিক, প্লাস্টিক, বায়ু ও পানি দূষণ—তরুণদের এই ঝুঁকির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। গবেষকদের মতে, প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য বা পরিবর্তনযোগ্য জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ায় রোগটি আগের তুলনায় দ্রুত শনাক্তও হচ্ছে।

ডব্লিউসিআরএফের গবেষণা ও নীতি নির্ধারণী বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. জিওটা মিত্রু বলেন, প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনেই একজন ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার রয়েছেন, যাঁদের প্রত্যাশার আগেই প্রাণঘাতী এই ব্যাধির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও প্রবীণদের তুলনায় কম বয়সীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার এখনো কম (গড় আক্রান্তের বয়স ৬০ বছরের বেশি), তবুও তরুণদের এই প্রবণতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক গবেষণায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সমাধান খুঁজতে যুক্তরাজ্যে ‘কিংস কলেজ লন্ডন’ এবং ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’র অর্থায়নে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ওপর একটি বিশেষ ট্রায়াল শুরু হচ্ছে। এই গবেষণার মাধ্যমে তরুণদের অন্ত্রের ক্যান্সার বৃদ্ধির মূল কারণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির সুনির্দিষ্ট চিত্র চিহ্নিত করা হবে।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক যত্ন মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, জাতীয় ক্যান্সার পরিকল্পনায় প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া রোগীদের তিন-চতুর্থাংশকে নিরাময় বা সুস্থ জীবনের ধারায় ফিরিয়ে এনে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষের জীবন রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..