✕


যুক্তরাজ্যের তেল শোধনাগারে বিষাক্ত দূষণ, দুই বছরে ৫৮ বার বিধি লঙ্ঘন!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৬, | ১৩:১২:০২ |

যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার স্ট্যানলো থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিষাক্ত রাসায়নিক ও তেল স্থানীয় নদী ও মার্সি মোহনায় ছড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের হাতে পাওয়া পরিবেশ সংস্থার নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর বিবিসির।

চেশায়ারের এলেসমেয়ার পোর্টে অবস্থিত স্ট্যানলো শোধনাগার পরিচালনা করে ইইটি ফুয়েলস, যা আগে এসার নামে পরিচিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত অনুমতিপত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় তেল ও রাসায়নিক বাতাস ও পানিতে নির্গমনের অনুমতি রয়েছে। তবে দূষণ কমানো এবং পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

পরিবেশ সংস্থা (ইএ)-র নথি অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শোধনাগারটির রাসায়নিক নির্গমন অনুমোদিত সীমা শত শতবার ছাড়িয়েছে। ইএ এসব ঘটনাকে অনুমতিপত্রের শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে ৫৮ বার চিহ্নিত করেছে, যা আইনগত অপরাধ হতে পারে।

নথিতে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় সায়ানাইড, বেনজেন ও ভারী তেলের মতো বিষাক্ত পদার্থ বাতাস ও স্থানীয় জলপথে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে থর্নটন ব্রুক ও গওয়ি নদী রয়েছে, যেগুলো পরে মার্সি মোহনায় গিয়ে মিশেছে। মার্সি মোহনা ‘সাইট অব স্পেশাল সায়েন্টিফিক ইন্টারেস্ট’ (এসএসএসআই) হিসেবে সংরক্ষিত। এখানে ডলফিনসহ বিপন্ন প্রাণী এবং বিরল প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে।

ইএ’র নথিতে দেখা যায়, সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন অনুমোদিত মাত্রার সাত গুণে পৌঁছায়। গওয়ি নদীতে সায়ানাইডের মাত্রা অনুমোদিত সীমার আট গুণের বেশি এবং তেল ১৩ গুণের বেশি ছিল।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে বৃষ্টির পানির সঙ্গে তেল শোধনাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি ঘটনাকে ইএ ‘গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করে। দুর্গন্ধ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে ভূগর্ভস্থ পানিতেও তেল দূষণের তথ্য পাওয়া যায়। তবে ইইটি ফুয়েলস দাবি করে, তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সীমিত ছিল এবং শোধনাগারের ভেতরের দুটি কূপের মধ্যেই ছিল।

২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আবারও তেল ছড়িয়ে পড়ে। ইএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৩৬ ঘণ্টায় এক টনের বেশি তেল থর্নটন ব্রুকে গিয়ে সেখান থেকে মার্সি মোহনায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃপক্ষকে ঘটনা জানালেও ছড়িয়ে পড়া তেলের পরিমাণ জানাতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় নেয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ তথ্য দেওয়ার কথা।

ঘটনার পর ইএ, ন্যাচারাল ইংল্যান্ড, স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মৎস্য সংস্থার সমন্বয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, তেল নদীতে এক মাইলের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। রিডবেড এলাকায় বাদামি দাগও দেখা যায় এবং সেখানে ডানলিনসহ বিভিন্ন জলচর পাখি ছিল।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভাসমান বাধা বসানো হয়। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কম বিবেচনা করা হলেও মার্সি মোহনার স্থানীয় ককল সংগ্রহের এলাকা পাঁচ সপ্তাহ বন্ধ রাখা হয়। খাদ্যমান পরীক্ষা শেষে এলাকাটি নিরাপদ ঘোষণা করা হয়। এতে স্থানীয় জেলেদের আয় করতে বিলম্ব হয়, যদিও পরে মৌসুমের বাকি সময়ে তারা ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পেরেছিলেন।

ইএ পরে সেপ্টেম্বরের ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠানটির অনুমতিপত্রের ‘ছোটখাটো’ লঙ্ঘন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। ন্যাচারাল ইংল্যান্ডও তদন্ত শুরু করেছিল, তবে পরে তা বন্ধ করে দেয়। সংস্থাটি জানায়, সংরক্ষিত এলাকায় পরিবেশগত প্রভাব সামান্য ছিল।

তবে ন্যাচারাল ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে বলা হয়, স্ট্যানলো শোধনাগারের অনুমতিপত্রে ঝড়ের পানির সঙ্গে কত পরিমাণ তেল বের হতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। সংস্থাটি জানায়, পরিবেশগত অনুমতিপত্রের শর্ত মানা হয়েছে কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব ইএ’র।

পরিবেশবাদী সংগঠন রিভার অ্যাকশনের প্রধান জেমস ওয়ালেস বলেন, এসব নথি দূষণের ঘটনাকে গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো এবং প্রমাণ উপেক্ষা করার আশঙ্কা তৈরি করছে। তিনি পরিবেশ আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

চেশায়ার ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী শার্লট হ্যারিস বলেন, বর্তমান বিধিব্যবস্থা নদী দূষণের মূল কারণ বন্ধ করতে পারছে না। দূষণ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এমন ঘটনা যাতে শুরুতেই না ঘটে, সে বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ইএ’র তদন্ত এখনো চলছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা নিয়ে পৃথক ফৌজদারি তদন্তও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের ঘটনাগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ইইটি ফুয়েলস জানিয়েছে, অতীতের কিছু অনুমতিপত্র লঙ্ঘনের ঘটনা তাদের বর্তমান কার্যক্রম ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্জ্যপানি অবকাঠামোয় ২ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করেছে তারা। পরিবেশ সংস্থার কমপ্লায়েন্স রেটিংও ২০২৩ সালের ‘এফ’ থেকে ২০২৪ সালে ‘ই’তে উন্নীত হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ১২টি অভিযোগে ইইটি ফুয়েলস দোষ স্বীকার করেছে। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সাজা হওয়ার কথা আগামী মাসে। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..