✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৪, | ১৩:০৯:৩২ |লাটভিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রিস কুলবার্গের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ও ইউক্রেনপন্থী ইউনাইটেড লিস্ট।
ভোট গণনার ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত ফলাফলে দলটি প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতাবাদী দল লাটভিয়া ফার্স্ট, পেয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সার্বভৌম শক্তি পেয়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট।
শনিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ছিল মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কুলবার্গের প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়- এসব ইস্যু নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে ছিল। লাটভিয়া ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এবং রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেশটির রাজনীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লাটভিয়ার স্বাধীনতার পর এটি ছিল দেশটির ১৫তম সায়েমা বা পার্লামেন্ট নির্বাচন। দেশটির পার্লামেন্টে মোট ১০০টি আসন রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি।
ক্ষমতায় থাকলেও জোট গঠনে চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে ইউনাইটেড লিস্টের বড় ব্যবধানে জয় কুলবার্গের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির নেই। ফলে পরবর্তী সরকার গঠনে তাকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে হবে।
এর আগে মে মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারের ওপর চাপের মধ্যে পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে কুলবার্গ সরকার গঠন করেন। ইউক্রেন থেকে বিচ্যুত ড্রোন লাটভিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভও তৎকালীন রাজনৈতিক সংকটকে তীব্র করেছিল।
বর্তমান জোটের দুই শরিক দলের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়ায় নতুন সরকার গঠনের আলোচনা কুলবার্গের জন্য জটিল হতে পারে। তবে নির্বাচনের ফলাফলে লাটভিয়ার ইউরোপপন্থী ও ইউক্রেনপন্থী পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয় লাটভিয়া ফার্স্ট
ভোটের ফলাফলে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লাটভিয়া ফার্স্ট। দলটি ইউক্রেনকে সমর্থন করলেও জাতীয়তাবাদী ও জনতাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত। দলটির ১৩ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ায় নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কুলবার্গের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড লিস্টের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ এখনও স্পষ্ট নয়।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সার্বভৌম শক্তি। দলটি ইউক্রেনের জয় কামনা করার কথা বললেও কিয়েভকে সহায়তায় ব্যয় করা অর্থ দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা হলে তা বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করে। ভোট গণনার পর্যায়ে দলটি প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। তবে অন্য বেশ কয়েকটি দল এই দলের সঙ্গে জোট গঠনে অনাগ্রহী।
বহুদলীয় ও খণ্ডিত রাজনীতি
লাটভিয়ার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বহুদলীয় ও খণ্ডিত। দেশটির কোনও একটি দলের পক্ষে সাধারণত ২০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া কঠিন হয়ে থাকে। ফলে নির্বাচনের পর একাধিক দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন করাই স্বাভাবিক।
এবারের নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য একটি দলকে কমপক্ষে ৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে ধারণা করা হয়েছিল, সাতটি দল এই সীমা অতিক্রম করতে পারে।
আংশিক ফলাফলে ইউনাইটেড লিস্টের পাশাপাশি লাটভিয়া ফার্স্ট, সার্বভৌম শক্তি, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স, প্রগ্রেসিভস এবং নিউ ইউনিটি- এই দলগুলো ৫ শতাংশের সীমা পার করেছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ও আসন বণ্টন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। লাটভিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চূড়ান্ত সরকারি ফলাফল ১৯ অক্টোবরের মধ্যে অনুমোদিত হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি বড় ইস্যু
নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপও বড় বিষয় ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা হ্রাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা ইস্যুটি অবশ্য অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর থেকে লাটভিয়া প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। দেশটি এখন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার হুমকি
ন্যাটো সদস্য লাটভিয়া রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক ও হাইব্রিড হুমকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটির নিরাপত্তা নীতি আরও কঠোর হয়েছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারেও রাশিয়ার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ, ড্রোন অনুপ্রবেশ এবং ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ফলে বড় ব্যবধানে ইউনাইটেড লিস্টের জয় শুধু কুলবার্গ সরকারের প্রতি ভোটারদের সমর্থনের বিষয় নয়; একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে লাটভিয়ার নিরাপত্তা ও ইউরোপমুখী নীতির ধারাবাহিকতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নতুন সরকার গঠনে কোন কোন দল কুলবার্গের সঙ্গে যুক্ত হবে, সেটিই এখন লাটভিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা