✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২৯, | ০১:৩৭:৩৫ |মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাইলফলক রচনা করে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কক্ষপথে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও সর্ববৃহৎ রকেট ‘স্টারশিপ’। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস’ চন্দাভিযান কর্মসূচির মূল যান হিসেবে নিজেদের কার্যকারিতা ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি প্রমাণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সোমবার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অভিযান পরিচালনা করে।
টেক্সাসের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত স্পেসএক্সের নিজস্ব উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ‘স্টারবেস’ থেকে সোমবার সকালে ৪০০ ফুট (১২৪ মিটার) দীর্ঘ এই বিশালাকার রকেটের উৎক্ষেপণ ঘটে। তিন বছরের দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এটি ছিল স্টারশিপের ১৪তম পূর্ণাঙ্গ উৎক্ষেপণ। তবে পূর্বের পরীক্ষাগুলোর সীমা শুধু ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী অঞ্চল কিংবা মহাকাশের শেষ সীমান্ত স্পর্শ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যানগুলো বিস্ফোরিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে আছড়ে পড়েছিল। এবারই প্রথম ২৭৫ কিলোমিটার (১৭০ মাইল) উচ্চতায় স্থির হয়ে পৃথিবীর চারপাশে প্রায় ১০ ঘণ্টায় ছয়টি পূর্ণ চক্কর দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শেষ হবে চিলির নিকটবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরনের মাধ্যমে।
উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ্য চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। মহাকাশযানের একটি ইঞ্জিন নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে গেলে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দেয়। তবে যানের অন্যান্য সমস্ত আধুনিক কলকব্জা নিখুঁতভাবে সচল থাকায় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিনটির আর অতিরিক্ত প্রয়োজন না পড়ায়, মিশন কন্ট্রোল রুমের প্রকৌশলীরা কয়েক মিনিটের টানটান উত্তেজনার পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর পরপরই মিশন কন্ট্রোল থেকে ঘোষণা আসে—‘স্টারশিপ এখন কক্ষপথে’। এরপরই পুরো স্পেসএক্স প্রাঙ্গণ উল্লাসে ফেটে পড়ে।
অভিযানের অংশ হিসেবে স্টারশিপ মহাকাশে নিয়ে গেছে ২৬টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্টারলিংক স্যাটেলাইট, যা কক্ষপথে থাকা আগের ১১ হাজার স্যাটেলাইটের বহরে যুক্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সেবাকে আরও গতিশীল করবে। একের পর এক স্যাটেলাইটগুলো মহাকাশযান থেকে নিখুঁতভাবে নির্গত হওয়ার দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষ করে উৎক্ষেপণস্থলে উপস্থিত প্রকৌশলী ও দর্শনার্থীরা।
ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হিসেবে নকশা করা ১২৪ মিটার দৈর্ঘ্যের এই রকেটের প্রথম ধাপের বুস্টারটিকে টেক্সাসের স্টারবেসে ফিরিয়ে না এনে মেক্সিকো উপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়। জনবসতির ওপর কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা ধ্বংসাবশেষ পড়ে যেন জনসমর্থন বা জনপ্রিয়তা না কমে, সে কারণে স্পেসএক্স ও এর প্রতিষ্ঠাতা ইলোন মাস্ক সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। প্রকৌশলীরা গত জুলাই মাসে ভারত মহাসাগরে অবতরন করা পূর্ববর্তী স্টারশিপের উদ্ধারকৃত কাঠামো পর্যালোচনা করে এবারের যানের তাপ নিরোধক বর্মে বেশ কিছু জরুরি পরিবর্তন এনেছেন।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে, পরবর্তী অভিযানে স্টারশিপকে সরাসরি উৎক্ষেপণ প্যাডে ফিরিয়ে আনা হবে এবং বিশালাকার যান্ত্রিক বাহু দিয়ে মাঝ আকাশে ধরে ফেলা হবে। এই জটিল প্রক্রিয়ায় সফলতা মিললে চলতি বছরের শেষ দিকে বা আগামী বছরের শুরুতেই যানটিকে পুনরায় মহাকাশে পাঠাবে প্রতিষ্ঠানটি।
নাসার গুরুত্বপূর্ণ চন্দাভিযান কর্মসূচির জন্য স্টারশিপের এই কক্ষপথ যাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নাসার ঘোষিত ‘আর্টেমিস ৩’ অভিযানের অংশ হিসেবে আগামী বছরের মাঝামাঝি পৃথিবীর কক্ষপথে একটি জটিল মহাকাশ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এতে মহাকাশচারীবাহী ওরিয়ন ক্যাপসুল, ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ এবং ইলোন মাস্কের ‘স্টারশিপ’ যৌথভাবে অংশ নেবে। পরবর্তীতে ২০২৮ সালের ‘আর্টেমিস ৪’ অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন পর মানুষ আবারও চাঁদের মাটিতে পা রাখবে, যেখানে পরিস্থিতি ও প্রস্তুতির ওপর ভিত্তি করে স্টারশিপ বা ব্লু মুনের মধ্যে যেকোনো একটি ল্যান্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
সূত্র: এপি