✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২৬, | ১৮:০৫:২৩ |সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ওপর ইরানের আর কোনো আস্থা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দাবি করেন, অতীতে আলোচনার পর তেহরানে পাল্টা হামলা ও নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সর্বশেষ প্রস্তাবের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান এ কথা বলেন।
প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকান পক্ষের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই এবং আমরা জানি না ঠিক কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের সম্মেলনে যোগ দিতে এই সপ্তাহে পেজেশকিয়ান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সেখানে তারা এমন একটি চুক্তির প্রস্তাব দেন, যার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং সাতদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আরাগচি জানান, প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন করতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগবে, ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু হবে।
এই পরিকল্পনার আওতায় ওয়াশিংটনকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, দেশটির তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে রাখা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত এবং লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে।
এর বিনিময়ে তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যকৃত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই সমুদ্রপধ দিয়েই পরিবাহিত হতো এবং বর্তমানে এটিই তেহরানের প্রধান দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
পেজেশকিয়ান আলজাজিরাকে জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান ইরানের বার্তা ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই আলোচনাটি জুন মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। তাই গত মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া সেই চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
পেজেশকিয়ান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য ইরানকে দায়ী করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আগেই পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি এই পদক্ষেপকে ইরানের জন্য চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব এবং আলোচনার ফলে যুদ্ধ শেষ হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। পেজেশকিয়ান এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ইরান গত ২০০ বছরে কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরান সরকার কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়বে এমন ধারণা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছিল। তিনি বলেন, আমরা আমেরিকান ও ইসরায়েলি হামলার মোকাবিলা করেছি এবং ভবিষ্যতেও দৃঢ় অবস্থানে থাকব। তিনি আরও যোগ করেন, কোনো ইরানি কমান্ডারের হত্যাকাণ্ড কিংবা অর্থনৈতিক চাপ কোনো কিছুই ইরানকে পিছু হটাতে পারেনি।
তিনি বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ইসলামি দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। ইরান ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে থাকে কারণ সেখান থেকেই তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হয়।
তিনি বলেন, তেহরান আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে কিছু চায় না এবং কেবল তখনই পাল্টা ব্যবস্থা নেয় যখন অন্যরা নিয়ম লঙ্ঘন করে। পেজেশকিয়ান ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের কৌশলের সাথেও তুলনা করেন।
তিনি বলেন, যারা ইরানকে ওষুধ ও কাঁচামাল সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করছে, তারাই আবার গাজায় খাদ্য ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করা যাবে বলে যারা মনে করেন, তারা ‘ভুল হিসাব’ করছেন।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমাদের কোনো আঞ্চলিক পুলিশম্যানের প্রয়োজন নেই। তিনি অভিযোগ করেন, এই অঞ্চলের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসলামি দেশগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, ইসলামি বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
হুতিদের বিষয়ে ইরানের অন্যতম শীর্ষ এই নেতা বলেন, হুথিদের কর্মকাণ্ডের সাথে ইরানের কোনো সম্পর্ক নেই এবং অবিচারের শিকার যে কারও পাশে তেহরান সংহতি নিয়ে দাঁড়ায়। তিনি হুথি ও সৌদি আরবকে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এক ভাইয়ের বিরুদ্ধে আরেক ভাইয়ের লড়াই করা উচিত নয়। পাশাপাশি এই বিরোধ অবসানে ইরানের সহায়তার প্রস্তাবও দেন। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধবাজ হব না।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, ইরানের শত্রুরা দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশটি বর্তমানে ‘অভূতপূর্ব ঐক্য ও সংহতির’ সাক্ষী হচ্ছে।
তিনি জানান, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সাথে তিনি দুবার বৈঠক করেছেন। যার মধ্যে একটি বৈঠক সাত ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল এবং তাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে জমে থাকা অসামঞ্জস্য বা ভারসাম্যহীনতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চায় না ইরান স্বনির্ভর হয়ে উঠুক, কিন্তু আমরা আমাদের জনগণের ওপরই বিনিয়োগ করব।
সূত্র: আলজাজিরা।