✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২৫, | ১২:১৪:০৯ |যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কিছুটা আড়ালে রেখে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংয়ের তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প এটিকে ‘দারুণ বৈঠক’ বলে উল্লেখ করেন। দুই দেশের মধ্যে ইরান, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সংলাপ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ট্রাম্প বলেন, ২০১৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় থেকেই শির সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পারস্পরিক সম্মান এবং দুই দেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ভিত্তিতে এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করেন। এর জেরে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে দুই নেতা উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর শি জিনপিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচিত ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি একটি উদীয়মান শক্তি ও বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
শি বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা এমন হওয়া উচিত, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হারানোর চেষ্টা করবে না; বরং উভয় দেশ একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। প্রতিযোগিতা ‘স্বাস্থ্যকর’ হওয়া উচিত এবং তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান ইস্যুতে অগ্রগতি নেই
ট্রাম্প ও শির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
ট্রাম্প চীনের প্রতি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় সহযোগিতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এ বিষয়ে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো বড় অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। শি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল পরবর্তী সময়ে একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করা। তবে জুনে ঘোষণার পরই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
শি জিনপিংয়ের সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক
শি জিনপিংয়ের সফরে হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা সমালোচনা করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নানা উদ্বেগজনক বিষয় থাকা সত্ত্বেও শিকে এমন জাঁকজমকপূর্ণভাবে আমন্ত্রণ জানানো উচিত হয়নি।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেনও ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। তবে সব মার্কিন রাজনীতিক যে বৈঠটিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো সম্ভব।
তাইওয়ান ইস্যুতে পুরোনো বিরোধ
ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধ তাইওয়ান। স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ান প্রণালির বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে এবং বিষয়টি ‘সতর্কতার সঙ্গে’ পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউস এখনো বৈঠকের নিজস্ব সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেনি।
এর আগে মে মাসে শির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজের চূড়ান্ত অনুমোদন স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে আলোচনায় অস্ত্র বিক্রিকে তিনি ‘ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, তাইওয়ানের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অঙ্গীকার।
এদিকে তাইওয়ান আশঙ্কা করছে, চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
মে মাসের ইকোনমিস্ট/ইউগভ জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে চীনের তুলনায় তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি। জরিপে চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা নাকি চীনকে তাইওয়ান দখল করা থেকে ঠেকানো কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, এ প্রশ্নে ৩৬ শতাংশ ও ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতা যথাক্রমে দুই অবস্থানের পক্ষে মত দেন।
তবে জরিপে ৪০ শতাংশেরও কম উত্তরদাতা বলেছেন, চীন তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ নিলে তা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।