✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২০, | ১৪:১৯:৫২ |ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাশে থাকার কথা জানিয়েছে তুরস্ক।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের কিছু সামরিক ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে এবং ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তুরস্ক সেসব প্রয়োজন কীভাবে পূরণ করা যায়, তা বিবেচনা করবে।
শুক্রবার তুরস্কের সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর হামলা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশ একে অপরের পাশে থাকার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়। রিয়াদও এই সংঘাতে জড়াতে চায় না। যুদ্ধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এসব প্রস্তাবের বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি।
লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রগতি
এদিকে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বাড়িয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের সীমান্ত, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালিয়েছে হুতিরা। ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে ইয়ানবু, তাইফ, বায়শ ও ফারাসানেও হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ।
হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশটি বিভিন্ন মিত্র ও অংশীদারের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাচ্ছে বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানেরও প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি
সৌদির পাশে থাকার একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তানও। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী আরব নিউজকে বলেছেন, সৌদি আরবকে ‘যেকোনও মাত্রায়’, এমনকি সরাসরি সামরিকভাবেও রক্ষা করবে ইসলামাবাদ। তবে সৌদি আরব অতিরিক্ত পাকিস্তানি সেনা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর অবশ্য জানিয়েছে, বর্তমানে এই চুক্তির আওতায় কোনও সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। প্রয়োজন দেখা দিলে চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
কী এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় গত ৭ আগস্ট মক্কায়। এতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পরবর্তীতে ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর জোটটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। একই বৈঠকে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি মহাসচিব এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন।
চুক্তিতে সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অন্য দেশকেও এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ন্যাটোর সঙ্গে পার্থক্য
তবে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর মতো সমন্বিত সামরিক কমান্ড কাঠামো ও স্থায়ী যৌথ বাহিনী এই জোটে এখনও নেই। এমনকি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কী প্রক্রিয়ায় কার্যকর হবে, সেটিও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ইস্তাম্বুলের বৈঠকে অবশ্য তিন দেশ যৌথ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনের বিষয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফলে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর বাস্তব সক্ষমতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে নিজেদের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে ক্রমেই বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। সূত্র: আল-জাজিরা