✕


প্রত্যেক মার্কিনিকে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-১০, | ১৩:৩৮:১৩ |

নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট—দখলে নিতে পারলে দেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা) করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারের ব্যয় হতে পারে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

মঙ্গলবার টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম মধ্য-মেয়াদি জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া দীর্ঘ বক্তৃতায় ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এবারই প্রথম এ ধরনের সম্মেলনের আয়োজন করল দলটি।

তবে পাঁচ হাজার ডলারের এই অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে, এর অর্থের উৎস কী হবে কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। শুধু বলেছেন, এই অর্থ পাওয়া গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যয় করতে হবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই ডেমোক্র্যাটরা একে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে এ ধরনের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আইনগতভাবে কতটা বৈধ।

ব্যয় হতে পারে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি। প্রত্যেককে পাঁচ হাজার ডলার করে দেওয়া হলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

এত বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনও স্পষ্ট পরিকল্পনা দেননি। তার বক্তব্যে এ অর্থ সরাসরি সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে, নাকি অন্য কোনও রাজস্ব উৎস ব্যবহার করা হবে—তাও পরিষ্কার হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। ফলে প্রেসিডেন্ট এককভাবে এই অর্থ বিতরণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডালাসের বক্তৃতায় ট্রাম্প এই অর্থকে ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ডস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ পরিকল্পনার জন্য কংগ্রেসের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাইবেন কি না, সে বিষয়ে কোনও বক্তব্য দেননি তিনি।

অর্থ যুক্তরাষ্ট্রেই খরচ করতে হবে
ট্রাম্প তার ঘোষণার সময় বলেন, রিপাবলিকানরা হাউস ও সিনেট—দুই কক্ষেই জয়ী হলে তিনি প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলারের ‘ডিভিডেন্ড’ দেবেন।
তিনি রসিকতার সুরে বলেন, “আমরা চাই না আপনারা এই অর্থ খরচ করতে কানাডায় চলে যান।”

এরপর তিনি বলেন, “আমরা চাই না আপনারা চীন বা জার্মানিতে গিয়ে এই অর্থ খরচ করেন। আপনাদের এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রেই খরচ করতে হবে।”

তবে নাগরিকরা সত্যিই অর্থটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ব্যয় করছেন কি না, তা কীভাবে সরকার পর্যবেক্ষণ করবে—এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেননি ট্রাম্প।

মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই বড় অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যের দাম নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ইরানের পাল্টা হামলার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর হামলা যেমন রয়েছে, তেমনি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য তার ওপর চাপ রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা
বুধবার ট্রাম্প তার সমর্থকদের সতর্ক করে বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ততদিন তেলের দামও কমবে না।

ডালাসে রিপাবলিকান সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতাতেও তিনি যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে সাময়িক অর্থনৈতিক চাপ ও দুর্ভোগ মেনে নেওয়া প্রয়োজন।

ট্রাম্পের দীর্ঘ বক্তৃতার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল যুদ্ধের কারণে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি সাধারণ মানুষের ব্যয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই ঘোষণায় সম্মেলনস্থলে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

এর আগেও নগদ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প
নাগরিকদের সরাসরি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। এর আগে তিনি শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের দুই হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তবে এবারের প্রস্তাবের পরিমাণ তার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। ফলে সরকারি কোষাগারের ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নির্বাচনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতির নজিরও রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়, ২০২০ সালের জর্জিয়া সিনেট নির্বাচন ঘিরে ডেমোক্র্যাটরা তাদের দল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিলে দুই হাজার ডলারের ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

নির্বাচনী আইন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এটি নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করছে কি না।

ফেডারেল আইনে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সাফল্যের শর্তে নাগরিকদের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আইনগতভাবে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিকে সরাসরি ভোট কেনার প্রস্তাব হিসেবে না দেখে কর কমানোর মতো একটি অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এটি বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’-কে এক নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে নিশ্চিত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষার আওতায়ও পড়তে পারে।

ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাটি বাস্তবে রূপ দিতে গেলে কংগ্রেসের অনুমোদন, সরকারি ব্যয়ের আইনগত কাঠামো এবং নির্বাচনী আইনের সীমারেখা—সবকিছু নিয়েই আরও বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিপুল অঙ্কের এই অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে। তবে এর অর্থায়ন, বাস্তবায়ন ও বৈধতা নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় এটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..