✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৭, | ১৪:৪৬:৪৩ |চীন-নেপাল সীমান্তের তিব্বত অঞ্চল থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর বন্যার কারণ এবং আগাম সতর্কতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, চীনের পক্ষ থেকে সময়মতো সতর্কবার্তা দেওয়া হলে সীমান্তের নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষদের অনেককে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হতে পারত।
চীন অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চীনের ভূখণ্ডে কোনো ‘ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগের বাঁধ’ ধসে নেপালে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—এমন দাবি ‘ভুয়া’।
চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের দিকে একটি ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পসদৃশ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যাপক কাদাধস সৃষ্টি হয় এবং চীন-নেপাল সীমান্তের গিরং-রাসুওয়াগাধি এলাকায় চীনা ও নেপালি—উভয় পাশেই হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘অভিযোগ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।’
আগাম সতর্কতা নিয়ে প্রশ্ন
নেপালের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, রাসুওয়াগাধি-গিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র এবং গিরং বন্দরেও যখন দুর্যোগের আঘাত লাগে, তখন নিচের দিকে থাকা মানুষদের সতর্ক করার সুযোগ ছিল কি না।
নেপালের সাংবাদিক মহল থেকেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, নেপাল তার প্রতিবেশীদের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করলেও এমন ভয়াবহ দুর্যোগের আগাম সতর্কতা না পাওয়ায় দেশটিকে বড় ধরনের মানবিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
নেপালের সাবেক জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান নির্বাহী গোবিন্দ রাজ পোখারেলও সীমান্ত এলাকায় আরও শক্তিশালী দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, চীন ও নেপালের সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (GLOF) ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। উন্নত স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তির মাধ্যমে চীনের পক্ষ থেকে এমন কোনো পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল কি না এবং তা নেপালকে জানানো হয়েছিল কি না—সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
পোখারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যার স্রোত এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে নদীর তীর থেকে মানুষকে সরে যেতে সতর্ক করা পুলিশ সদস্যদের কয়েকজনও স্রোতে ভেসে যান। নেপালের রাসুওয়া জেলায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন।
কীভাবে বন্যার সৃষ্টি?
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের হিমবাহ অঞ্চলের কাছে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বরফ ও পাথরের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। সেটি কোনো হিমবাহ-হ্রদে পড়ে অথবা নদীর গতিপথ আটকে দিয়ে পানির প্রবল স্রোত তৈরি করতে পারে।
পরে হিমবাহের বরফ, গলিত পানি ও বিপুল পরিমাণ পাথর-কাদা মিশ্রিত সেই স্রোত লহেন্দে খোলা হয়ে ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে। এর ফলেই নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (USGS) সর্বশেষ বিশ্লেষণে ওই সময়ে ভূমিকম্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে ভূমিধস বা হিমবাহ ধসের প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে।
নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (GLOF) ঘটেছিল কি না, তা তদন্ত করছে।
আগেও একই এলাকায় বন্যা
গত বছরের আগস্টেও তিব্বতের একটি হিমবাহ-হ্রদ অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে উপচে পড়ায় একই অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হন এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী একটি সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এবারও চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং বন্দরের কাছে কাদাধস হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নিখোঁজ থাকতে পারেন। দুর্যোগের কারণে চীনের দিকে গিরং বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহও বিচ্ছিন্ন হয়েছে। গিরং বন্দর চীন ও নেপালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সূত্র: এনডিটিভি।