✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৭, | ১৪:২৬:৫২ |নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের বেশিরভাগই ভারতীয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের রাসুয়া অঞ্চলের ভোতেকোশি নদীর আশপাশের বাড়িঘর, সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায় এবং আরও ২৬ জনের মরদেহ নওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
এদিকে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র চিতওয়ানসহ কয়েকটি পৌরসভায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় আট টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আকস্মিক এই বন্যার কারণ নিয়ে শুরুতে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকেই এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা মনে করছে।
আকস্মিক বন্যার কারণ কী
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে শুরুতে নানা ধরনের ধারণা সামনে আসে। তবে এখন নেপালের কর্তৃপক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিধস ও বরফ ধসের বিষয়টিই সামনে এসেছে।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী ভূকম্পন তরঙ্গের আরও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূকম্পন শক্তি আসলে ভূমিধস থেকেই তৈরি হয়েছিল।
নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ধসে পড়ার সঙ্গে পাথর ও অন্যান্য পলিও নিচে নেমে আসতে পারে। এর ফলে নদীর প্রবাহে বাধা তৈরি হয়ে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে এসে এই বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলছে। তবে এবারের ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
হিমবাহের কোনো হ্রদ হঠাৎ পানি ছেড়ে দিয়েছিল কি না, নদীর প্রবাহে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হয়েছিল কি না এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের তথ্যও খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
সীমান্তের তিব্বত অংশেও বিপর্যয়
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও কাদাধসের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।
নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
গিয়িরং সীমান্ত চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। বুধবার দুই দেশের সীমান্তে কাদাধস শুরু হওয়ার পর চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বড় ধরনের হতাহতের খবর জানিয়েছিল।
নিখোঁজের তালিকায় বিদেশিরা
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয়দের পাশাপাশি অস্ট্রেলীয়, ইউক্রেনীয় ও ব্রিটিশ নাগরিকও রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকায় অল্পসংখ্যক নিউজিল্যান্ডের নাগরিক থাকার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি বা যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া ৫৩ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ইউক্রেনীয়দের কেউ নিহত বা আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
একটি ট্যুর কোম্পানির ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, নেপাল তিব্বত সীমান্তে তাঁদের একটি ভ্রমণ দলের সঙ্গে থাকা এক ডজন ব্রিটিশ নাগরিকের পরিবারের কাছ থেকে তিনি হাজার হাজার মিসড কল পাচ্ছেন।
ওই ট্যুর অপারেটর জানিয়েছে, উদ্ধারকাজের জন্য তারা একটি হেলিকপ্টার ভাড়া করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেটি উড়তে পারেনি। কোম্পানিটির চারজন নেপালি ট্যুর গাইডও নিখোঁজ রয়েছেন।
ব্যবস্থাপক কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, সকাল ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত গাইডদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ওই সময় তাঁদের তিব্বতের অভিবাসন দপ্তরে থাকার কথা ছিল। এরপর থেকে তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এত পর্যটক সেখানে কেন
যে এলাকায় এই ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, সেটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ধর্মীয় কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। বন্যাকবলিত এলাকার কাছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র দুটি উচ্চভূমির হ্রদ রয়েছে।
এর একটি তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর। অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ।
প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে মানস সরোবরে যান। বছরের এই সময়টিতে বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা মানস সরোবর ভ্রমণ এবং গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নানের জন্য আসেন।
আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত জানিয়েছেন, এই পথটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পূর্ণিমার সময়কে শুভ মনে করা হয়। এ কারণে সাধারণত এই সময়েই পর্যটকেরা এখানে আসেন।
ফলে ধর্মীয় ভ্রমণ ও জনপ্রিয় পর্যটন রুটের কারণে দুর্যোগের সময় এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি ছিল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা