হিমালয়ে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্যোগ শুধু পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তার প্রভাব নেমে আসে সমতলে, নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে বহু দূর। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার প্রেক্ষাপটে এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। তাঁর ভাষায়, হিমালয়ে যা গলে, তা সমুদ্রে গিয়ে মেশে।
তাই হিমালয়ের পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় নেপাল, ভারত, চীন ও ভুটানকে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড অন্বেষণ সামিটে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারত-নেপাল সম্পর্ককে নতুন পরিবেশগত বাস্তবতার আলোকে দেখার আহ্বান জানান খানাল।
তিনি বলেন, দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সম্পর্ককে ‘রুটি-বেটি’ ও ‘সীতা-রাম’-এর মতো সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বন্ধনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে এসেছে। এসব ঐতিহাসিক সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশগত সহযোগিতাকেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি করতে হবে।
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার প্রসঙ্গ তুলে খানাল বলেন, পাহাড়ে সৃষ্টি হওয়া বিপর্যয় কীভাবে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে এসে জনপদকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তা এবার সরাসরি দেখা গেছে।
হিমালয়ের একটি ফাটল থেকে প্রবল বেগে পানির স্রোত ভাটির দিকে নেমে এসে নেপালের বিভিন্ন এলাকা বিধ্বস্ত করে। তাঁর মতে, এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে হিমালয়ের পরিবেশগত নিরাপত্তা কেবল কোনো একটি দেশের বিষয় নয়।
খানালের মতে, চীন, নেপাল, ভারত ও ভুটান একই বৃহৎ হিমালয়ভিত্তিক বাস্তুসংস্থানের অংশ। ফলে একটি দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় অন্য দেশের নদী, কৃষি, জনজীবন ও পানির নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু হিমালয়ের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে চার দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের এলাকাগুলো এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়লেও আশঙ্কাটি পুরোপুরি অমূলক ছিল না বলে মন্তব্য করেন খানাল।
তিনি জানান, অতীতে নেপাল থেকে নেমে আসা আকস্মিক বন্যা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব ফেলেছে। ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ নেপাল থেকে গণ্ডক বা নারায়ণী ও কোসি নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের সমভূমির দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
বুধবারের আকস্মিক বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়। রাজ্য প্রশাসন জরুরি বৈঠক করে এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক রাখে।
যদিও এবার বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে, সীমান্তের ওপারে পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তার প্রভাব দ্রুত ভারতীয় সমভূমিতেও পৌঁছাতে পারে—এমন আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে।
শুধু বন্যা নয়, হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন ভবিষ্যতে ভয়াবহ পানিসংকটও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি যত বদলাবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে এই অঞ্চলের প্রায় দুইশ কোটি মানুষের বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতার ওপর।
হিমালয়ের বাস্তুসংস্থানের এই পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখছেন না খানাল। তিনি এটিকে “সভ্যতার জন্য হুমকি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বার্তা স্পষ্ট—হিমালয় রক্ষায় এখনই আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। কারণ হিমালয়ের পানি, নদী ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ এক দেশের হাতে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ। এনডিটিভি
এ জাতীয় আরো খবর..