সর্বশেষ :

হাওরে পানি চাপে ভাঙছে বাঁধ

নিম্নাঞ্চলে বন্যা, ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে দুশ্চিন্তা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-৩০, | ১২:২৪:৫০ |
দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এ বৃষ্টির কারণে দেশের পাঁচ জেলায় বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলার মধ্যে এরই মধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়ে গেছে। নদ-নদীর পানি বাড়ায় বাকি তিন জেলায় বন্যা হতে পারে। দেশে আরো অন্তত পাঁচদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

এদিকে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে উজানের পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে বৌলাই নদীর পানির প্রবল চাপে উপজেলার ঝিনারিয়া হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। এর আগে একইভাবে এরনবিলের বাঁধ ভেঙে মনাই নদের পানিতে ফসল নিমজ্জিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। পানি বাড়তে থাকায় হাওরের নিচু এলাকার বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সূত্র। এসব নদী হলো ভুগাই, কংস, মনু, সোমেশ্বরী ও মগরা। এর মধ্যে মনু বাদ দিয়ে বাকি তিন নদীই নেত্রকোনা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর বাইরে সুরমা, কুশিয়ারা নদীর পানি এক-দেড় মিটারের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘এসব নদী আকারে ছোট। তাই ভারি বৃষ্টি হলে এভাবে পানি বেড়ে যায়। সুরমার পানি ৫০ সেন্টিমিটার বেড়েছে আর কুশিয়ারার বেড়েছে এক সেন্টিমিটারের মতো। সোমেশ্বরী, কংস, মনু নদীর পানি দেড় সেন্টিমিটারের মতো বেড়েছে। এগুলো পাহাড়ি নদী, তাই ভারি বৃষ্টি হলেই পানি দ্রুত বাড়ে। বৃষ্টি কমে গেলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’ তিনি জানান, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে, ১৬১ মিলিমিটার। এছাড়া ভোলায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫১ মিলিমিটার, ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘এ বৃষ্টি যেকোনো এলাকায় একটানা হবে তা নয়। থেমে থেমে বিভিন্ন এলাকায় হতে পারে। বৃষ্টি চলতে পারে আগামী ৪ মে পর্যন্ত।’

টানা বৃষ্টির প্রভাব এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলায় পড়তে শুরু করেছে। এছাড়া উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল। পানি বেড়েছে হাওরাঞ্চলেও। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার হাকালুকি কাউয়াদিঘী হাইল হাওরসহ হাওরাঞ্চলের এবার ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এর মধ্যে ২২ হাজার ৪০৯ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে, যা মোট জমির ৮২ ভাগ। এর মধ্যে ৮৮৭ হেক্টর বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধান তলিয়েছে সদর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওরে। এ হাওরের পানি নিষ্কাশনের জন্য মনু প্রকল্পের অধীনে তৈরি কাসিমপুর পাম্প হাউজে নিয়মিত পানি সেচ করতে না পারায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসল তলিয়েছে।

রাজনগর উপজেলা প্রশাসন জানায়, মনু সেচ প্রকল্পের আওতায় কাউয়াদিঘি হাওরে ৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, হাওর ও হাওরের বাইরের ৬২ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। ৩২৫ হেক্টর বোরো ধান ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষতির হিসাব করে নিশ্চিত করা যাবে।

বরিশালে দুইদিন ধরে বজ্রসহ টানা ভারি বর্ষণ ও দমকা হাওয়া অব্যাহত রয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে বরিশাল জেলাজুড়ে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে গত দুইদিনের ভারি বর্ষণে কৃষকের খেতে কাটা ধানগুলো পানিতে তলিয়ে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। সূত্রমতে, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, বাবুগঞ্জ, আগৈলঝাড়া ও গৌরনদীসহ ১০ উপজেলায় ৬১ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমির পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাগেরহাটে বৃষ্টির পূর্বাভাসের আগে থেকেই ধান কাটা শুরু করেছিলেন কৃষকরা। তবে হঠাৎ ভারি বৃষ্টিতে শেষ রক্ষা হয়নি। জেলায় ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে এবার। অর্ধেকের বেশি ধান এখনো খেতে। দুদিন ধরে বজ্রসহ ভারি বৃষ্টির কারণে সেই ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘বাগেরহাটে সকাল থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ৯ হাজার হেক্টরের মতো ধান কেটে চাষীরা ঘরে উঠিয়েছেন। তিন হাজার হেক্টরের মতো জমির ধান এখনো কাটা অবস্থায় রয়েছে। ১০ শতাংশ ধান ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে টানা তিনদিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের শত শত হেক্টর পাকা বোরো ধান। নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানান, এ বছর উপজেলায় ১৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে বাকি ধান বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাছরিন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কীভাবে সরকারি সহায়তা দেয়া যায়, সে চেষ্টা চলছে।’

নেত্রকোনায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় হাওরে ঢুকছে পানি। মাঠের বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী হাওরে ৬৫ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের। আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী হাওরে গিয়ে দেখা যায়, রাতভর বৃষ্টিতে হাওরের বেশির ভাগ জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার কৃষকরা ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটার কাজে ব্যস্ত।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..