✕

সর্বশেষ :
পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহে বাধা, আটক ফিলিস্তিনি নারীরা খুলনায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কলেজছাত্র নিহত ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেলেন ১৪৯ পুলিশ সদস্য হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় হবে ৫-৬ টাকা নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ চার বছরে তাপপ্রবাহে ইউরোপে ২ লাখের বেশি মৃত্যু, সতর্ক করল ডব্লিউএইচও বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে ইলন মাস্ক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে কোভিড আমলের ঝুঁকিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি : বিশ্বব্যাংক সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎচালিত ডেটাসেন্টার চালু করল চীন

গ্যাভিওটাস: কলম্বিয়ার রুক্ষভূমিতে আধুনিক ‘ইউটোপিয়া’র জন্ম

শিশুদের সী-স খেলায় উৎপন্ন শক্তি থেকে পানি উত্তোলন | ছবি: গ্যাভিওটাস

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-০১, | ১৮:৪৪:৫৫ |
পৃথিবীর অন্যতম রুক্ষ ভূখণ্ডে যদি এক টুকরো সবুজ স্বর্গ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সেটি হবে কলম্বিয়ার গ্যাভিওটাস। ১৯৬০-এর দশকে যখন আধুনিক বিশ্ব নগরায়ন আর শিল্পায়নের নেশায় মত্ত, তখন ‘পাওলো লুগারি’ নামের ইতালীয়-কলম্বিয়ান এক দূরদর্শী যুবক অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিলেন। কলম্বিয়ার পূর্ব প্রান্তের রুক্ষ, জনমানবহীন সমভূমি ‘লস ল্যানোস’-এ তিনি গড়ে তোলেন স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব গ্রাম। যা আজ সারা বিশ্বের কাছে টেকসই জীবনযাত্রার এক অনন্য উদাহরণ।


লস ল্যানোস এলাকাটি চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। এখানে কখনো নামে বিধ্বংসী বৃষ্টি আর বন্যা, আবার কখনো প্রচণ্ড দাবদাহে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। সঙ্গে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত। কিন্তু লুগারি দমে যাননি। ১৯৭১ সালে ২০ জন উদ্যমী মানুষকে নিয়ে তিনি এ জনপদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নদীর ওপর দিয়ে উড়ে চলা সাদা পাখিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গ্রামটির নাম রাখা হয় ‘গ্যাভিওটাস’ বা গাঙচিল।

গ্যাভিওটাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দেশীয় প্রযুক্তি। এখানকার উদ্ভাবনগুলো যেমন অদ্ভুত, তেমনি কার্যকর। প্রতিকূল প্রকৃতি আর সীমিত সম্পদের মধ্যে কীভাবে টিকে থাকা যায় তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে গ্যাভিওটাস। এ সম্প্রদায়ের মানুষরা বুঝে নিয়েছিল, প্রকৃতিকে বদলানোর চেষ্টা না করে বরং তার সঙ্গে ‘সঠিক সম্পর্ক’ গড়ে তুলেই টিকে থাকতে হবে। আর সে ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় পরিবেশবান্ধব, স্বল্প ব্যয়ের ও সম্পূর্ণ স্থানীয় বাস্তবতার ওপর দাঁড়ানো একের পর এক উদ্ভাবন।

গ্যাভিওটাসের বাসিন্দাদের মধ্যে ছিলেন তরুণ প্রকৌশলী, গবেষক ও স্থানীয় বাসিন্দা—যারা একসঙ্গে কাজ করে গড়ে তুলেছিলেন এক বিকল্প জীবনধারা। তাদের অনেক ধারণার উৎস ছিল স্থানীয় আদিবাসী গুয়াহিবো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য। এরমধ্যে রয়েছে তালপাতার পুরু ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘর, যা তীব্র রোদ ও ভারী বৃষ্টিকে সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে। একইভাবে তারা শিখেছিল কীভাবে পাতার শিরা দিয়ে জাল ও দোলনা তৈরি করতে হয়, ফল থেকে তেল বের করতে হয়, কিংবা গাছের গুঁড়ি খুঁড়ে নৌকা বানাতে হয়।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তারা বেছে নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় প্রখর সূর্যালোক, আর পানীয় জলের জন্য তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের পাম্প—যার একটি ৪০ মিটার গভীর থেকেও পানি তুলতে সক্ষম। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব পাম্পের একটি শিশুদের খেলাধুলার সি-স (দোলনা)–এর সঙ্গে যুক্ত, যেখানে শিশুদের ওঠানামার গতিই ব্যবহার করা হয় পাম্প চালাতে। শিশুরা খেলতে খেলতে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা দিয়েই পানি তোলা যায়। একইভাবে, কলম্বিয়ার সমভূমির অনিয়মিত ও হালকা বাতাসকে কাজে লাগাতে স্থানীয় প্রকৌশলীরা ৫৭টি প্রোটোটাইপ পরীক্ষার পর তৈরি করেন হালকা ও কার্যকর উইন্ড টারবাইন।

গ্যাভিওটাসে শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল আলাদা। সাধারণ পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শেখানো হতো গাছ লাগানো, পানি পরিশোধন ও বোতলজাত করার মতো বাস্তব দক্ষতা। এমনকি পানির বোতলগুলোও এমনভাবে তৈরি করা হতো, যা সহজে একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে রাখা যায়। এ পদ্ধতি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সুবিধাজনক।

গ্যাভিওটাসের বড় সাফল্য হলো তাদের বনায়ন প্রকল্প। একসময় যেখানে কিছুই জন্মাত না, সেখানে তারা ৮০ লক্ষ ক্যারিবিয়ান পাইন গাছ রোপণ করে। এ বনাঞ্চল মাটির অম্লতা কমিয়ে দেয় এবং ২৫০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতির আবাসস্থলে পরিণত হয়। আজ তাদের খাদ্যের ৩০ শতাংশ আসে এ কৃত্রিম বন থেকে। এছাড়াও পাইন গাছের রেজিন থেকে তৈরি হচ্ছে টার্পেনটাইন ও বায়োফুয়েল, যা দিয়ে গ্রামের ট্রাক্টর ও মোটরসাইকেল চলে।

সময়ের সঙ্গে গ্যাভিওটাসের উদ্ভাবন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। লস লানোস অঞ্চলে তাদের ৫ হাজারের বেশি উইন্ড টারবাইন এবং ১২ হাজার পানির পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি রাজধানী বোগোটের সিউদাদ তুনাল এলাকায় হাজার হাজার সৌরচালিত পানি গরম করার যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে—যেগুলো বিক্ষিপ্ত সূর্যালোক থেকেও শক্তি সংগ্রহ করতে পারে।

শুধু কলম্বিয়াতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও এ প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, গ্যাভিওটাসের কোনো আবিষ্কারই পেটেন্ট করা নয়। তারা বিশ্বাস করে, ভালো কিছু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া উচিত। গ্যাভিওটাসের বাসিন্দারা বিশ্বাস করে, জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত, যাতে অন্যরাও তা ব্যবহার ও উন্নত করতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী চেলসি শেলি বলেন, ‘গ্যাভিওটাস শিখিয়েছে মাটির সাথে সঠিক সম্পর্কে বেঁচে থাকা কাকে বলে’।

বিবিসি অবলম্বনে

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..